ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের শীর্ষ বৈঠক, বাণিজ্য-বিনিয়োগে গুরুত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৯:৪৪ এএম

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের শীর্ষ বৈঠক, বাণিজ্য-বিনিয়োগে গুরুত্ব

ছবিঃ সংগৃহীত

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে বসেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান সানায়ে তাকাইচি। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর তারেক রহমান সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত দলটির গার্ড পরিদর্শন করেন।

অনুষ্ঠানে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পাশাপাশি দাঁড়ান। পরে তারেক রহমান তাঁর সফরসঙ্গীদের জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। একইভাবে সানায়ে তাকাইচি তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেন।

আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন তারেক রহমান। পরে দুই নেতা একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকের পর আলোচনার ফলাফল নিয়ে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যাশা

তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতের উন্নয়ন এবং চলমান অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য জাপান দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শিল্পায়নসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা এবং দক্ষ জনশক্তি জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

এ প্রেক্ষাপটে শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং সম্ভাবনাময় খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী

চার দিনের জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, জ্বালানি, উন্নত উৎপাদনশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানি প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও সফরের অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

মারুবেনি করপোরেশনের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা

জাপান সফরের প্রথম দিন সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। সেখানে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, জ্বালানি ও উন্নত উৎপাদনশিল্পে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনাও উঠে আসে।

বাংলাদেশের শিল্প ও কৃষি উৎপাদনের জন্য সার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। সার কারখানার সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন উৎপাদন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কৃষি খাতে সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে জাইকার সহযোগিতা

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গেও বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা, চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশ-জাপান দক্ষতা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া একটি প্রযুক্তি গ্রাম ও উদ্ভাবন নগরী প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও আলোচনায় উঠে আসে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি, গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বৈঠকে কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশলশিল্প এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর সঙ্গে বৈঠক

সফরের প্রথম দিন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান।

বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০০৬ সালে জাপানে তাঁদের সাক্ষাতের কথা স্মরণ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদারে তারো আসোর অবদানের স্বীকৃতি জানান এবং তাঁকে আবারও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করার ক্ষেত্রে এ বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সোমবার সকালে টোকিও পৌঁছান তারেক রহমান। নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াসুতাকা নাকাসোনে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখী দীর্ঘ সড়কের দুই পাশে বাংলাদেশ ও জাপানের জাতীয় পতাকা টানানো হয়। সফর ঘিরে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী যারা

জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

প্রতিনিধিদলে আরও রয়েছেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।

এ ছাড়া সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী এবং আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান।

দায়িত্ব নেওয়ার পর তৃতীয় বিদেশ সফর

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তারেক রহমানের তৃতীয় বিদেশ সফর। এর আগে তিনি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফর করেন তিনি।

জাপান সফরে শীর্ষ বৈঠক, ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা এবং অর্থনৈতিক ফোরামে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও শিল্পায়ন খাতে আলোচনার সুনির্দিষ্ট ফলাফল দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!