দেশের সরকারি ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিআরএইচ) রেডিওথেরাপি নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্যানসার রোগীরা। হাসপাতালের ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে চারটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে অকেজো থাকায় বাকি দুটি মেশিন দিয়ে সীমিত পরিসরে চিকিৎসাসেবা চালাতে হচ্ছে। এতে নতুন রোগীদের রেডিওথেরাপির নিবন্ধন বন্ধ রাখা হয়েছে। অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো কোনো রোগীকে ২০২৮ সালের শেষভাগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যানসারের ধরন, রোগের পর্যায়, অস্ত্রোপচারের ফলাফল ও চিকিৎসার সামগ্রিক পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত রেডিওথেরাপি শুরু করা জরুরি। সেখানে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষার পরিস্থিতি রোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য উদ্বেগজনক। চিকিৎসা বিলম্বিত হলে রোগীর সামগ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

গত ১৯ অক্টোবর সকাল থেকে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পাওয়ার আশায় হাসপাতালে অপেক্ষা করেও হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে গোপালগঞ্জের মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে। পেটে টিউমার শনাক্ত হওয়ার পর অস্ত্রোপচার এবং কেমোথেরাপি নিয়েছেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, এরপর তাঁর রেডিওথেরাপি নেওয়ার কথা। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, আপাতত নতুন রোগীদের সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না।
মোস্তফা কামাল বলেন, ‘কেমোথেরাপির পর রেডিওথেরাপি দেওয়ার কথা চিকিৎসক বলেছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো সিরিয়াল পাচ্ছি না। আমরা গরিব মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে থেরাপি নেওয়া সম্ভব না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এত কষ্ট করে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছি। কিন্তু সিরিয়াল পাচ্ছি না।’
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন টাঙ্গাইলের সাথিয়া খাতুন। স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর রেডিওথেরাপি নিতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁকেও জানানো হয়েছে, নতুন করে সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না। মেশিন অকেজো থাকায় দুই বছরের আগে সিরিয়াল পাওয়া যাবে না বলেও তাঁকে জানানো হয়েছে।
সাথিয়া খাতুন বলেন, ‘সরকারিভাবে থেরাপি দেওয়ার জন্য এত দূর থেকে এসেছি। এখানে এখন সিরিয়াল পাচ্ছি না। আমাকে সরকারিভাবেই চিকিৎসা নিতে হবে, বেসরকারি হাসপাতালে দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমার নেই। আমরা দিন আনি দিন খাই মানুষ। হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে, দুই বছরের আগে সিরিয়াল পাব না। মেশিন নাকি নষ্ট। আমরা গরিব মানুষ, যাব কোথায়? এই হাসপাতালে রেডিওথেরাপি বন্ধ রয়েছে বা তারা দিতে পারবে না, তা তো জানতামও না। কষ্ট করে সেই গ্রাম থেকে এসেছি।’
ছয়টি মেশিনের চারটিই অকেজো, নতুন নিবন্ধন বন্ধ
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কেন্দ্র। তুলনামূলক কম খরচে বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা এখানে আসেন। কিন্তু রোগীর তুলনায় রেডিওথেরাপি দেওয়ার সক্ষমতা কম থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চাপ বাড়ছিল। চারটি মেশিন দীর্ঘ সময় ধরে অকেজো থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, মোট ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে বর্তমানে দুটি দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তিন শিফটে এসব মেশিন পরিচালনা করে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
তবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হলেও নতুন রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পুরোনো সিরিয়াল অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতেই কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ কারণে গত দেড় মাস ধরে নতুন রোগীদের রেডিওথেরাপির নিবন্ধন বন্ধ রাখা হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বর্তমানে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজারের বেশি। তাঁদের অনেকেই অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি কিংবা অন্যান্য চিকিৎসা শেষে রেডিওথেরাপি নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে তাঁদের চিকিৎসার সময়সূচি নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
২০২৮ সাল পর্যন্ত সিরিয়াল, উদ্বিগ্ন রোগী ও স্বজনেরা
রেডিওথেরাপির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়টি রোগীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ক্যানসারের চিকিৎসা সাধারণত একাধিক ধাপে সম্পন্ন হয়। রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি কিংবা অন্যান্য চিকিৎসা একসঙ্গে বা পর্যায়ক্রমে দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপের সময় নির্ধারণ করেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।
কিন্তু রেডিওথেরাপির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হলে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নিয়ে রোগী ও স্বজনেরা দুশ্চিন্তায় পড়েন। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীদের জন্য বিকল্প প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বেসরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি নেওয়ার খরচ বহন করতে না পারায় অনেক রোগী সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে মেশিনের সংকট তাঁদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগকে আরও সীমিত করছে।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অপেক্ষমাণ রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অস্ত্রোপচারের পর রেডিওথেরাপিতে দেরি হলে বাড়ে উদ্বেগ
ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। উচ্চশক্তির বিকিরণ ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা বা তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। রোগের ধরন, অবস্থান, বিস্তার এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকেরা রেডিওথেরাপির প্রয়োজন ও সময় নির্ধারণ করেন।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর শরীরে থেকে যেতে পারে এমন ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের আগে টিউমারের আকার কমানো কিংবা রোগের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণেও এ চিকিৎসা ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেডিওথেরাপি কখন শুরু করা হবে, তা রোগীর নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল। তবে যেসব রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন, তাঁদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রাখা উদ্বেগজনক। চিকিৎসা বিলম্বিত হলে রোগ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু রোগীর সংখ্যা বিবেচনা করলেই হবে না; কার চিকিৎসা কতটা জরুরি, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি অপেক্ষমাণ রোগীদের জন্য বিকল্প চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
হাসপাতাল পরিচালক: আগের সিরিয়ালই ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বর্তমানে নতুন রোগীদের রেডিওথেরাপির সিরিয়াল নেওয়া হচ্ছে না। কারণ, আগের সিরিয়ালগুলোই প্রায় ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত বরাদ্দ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নতুন রোগীদের সিরিয়াল দিতে পারছি না। ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের দুই বছর অপেক্ষা করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।’
পরিচালক জানান, নতুনভাবে সিরিয়ালের অপেক্ষায় রয়েছেন সাড়ে সাত হাজার রোগী। বর্তমানে চালু দুটি মেশিন দিয়ে যতটা সম্ভব বেশি রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি এবং মেশিনের সংখ্যা কম হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নতুন মেশিন এলে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে। তখন আরও বেশি রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব হবে এবং অপেক্ষার সময় কমে আসবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন রেডিওথেরাপি মেশিনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়েও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।
তবে নতুন মেশিন স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষমাণ রোগীদের চিকিৎসা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ, নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন ও চালু করতে সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের প্রয়োজন তাৎক্ষণিক।
রেডিওথেরাপির সুযোগ বাড়াতে ১৭টি নতুন মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা
দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকার সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল।
তিনি বলেন, দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। রোগীদের যাতে রেডিওথেরাপি নিতে ছয় থেকে আট মাস দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে না হয়, সে জন্য ক্যানসার চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য ও বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন বা লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর স্থাপন করা হবে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে এসব মেশিন স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন মেশিনগুলোর মধ্যে ছয়টি ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে এবং বাকি ১১টি ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালে স্থাপন করা হবে। এতে রাজধানীর বাইরের রোগীরা নিজ নিজ এলাকার কাছাকাছি সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন বলে আশা করছে সরকার।
তবে নতুন মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমানে অকেজো হয়ে থাকা যন্ত্রপাতি সচল করা, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধু নতুন যন্ত্রপাতি কেনা নয়, সেগুলো যথাসময়ে স্থাপন, পরীক্ষা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
যন্ত্রপাতি স্থাপনে দীর্ঘসূত্রতা সহ্য করা হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি স্থাপন কিংবা পুরোনো ও অকেজো যন্ত্রপাতি অপসারণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, জীবনরক্ষাকারী ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা সরকারের অগ্রাধিকার। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের সিংহভাগ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয় করার কথাও তিনি বলেছেন।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে হলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা, যন্ত্রপাতি সরবরাহের অগ্রগতি এবং হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি হয়েছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয়ের পরামর্শ বিশেষজ্ঞের
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী সরকারি হাসপাতালে ক্যানসার রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, ‘ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়েও সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য রোগীদের দীর্ঘ ভোগান্তি অত্যন্ত দুঃখজনক। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর জীবনঝুঁকি বাড়ে। অথচ সংকট মোকাবিলায় সরকার কেন আগেই প্রয়োজনীয় মেশিনের ব্যবস্থা করেনি, সেই প্রশ্নও উঠছে।’
তিনি আরও বলেন, দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় করে হলেও রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হাসপাতালের মেশিন সচল করা ও নতুন মেশিন স্থাপনের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি বিকল্প পরিকল্পনাও প্রয়োজন। যেসব রোগীর দ্রুত রেডিওথেরাপি নেওয়া জরুরি, তাঁদের অন্য সরকারি বা সক্ষম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং ব্যয় বহনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অপেক্ষমাণ রোগীদের একটি অংশের চিকিৎসা দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, রোগী স্থানান্তরের নীতিমালা এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে বছরে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ক্যানসার রোগী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার গ্লোবক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে আনুমানিক ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭ হাজার ৮২০ জন এবং নারী ৭৯ হাজার ৪৪৩ জন।
দেশে ক্যানসার রোগীর এই বিপুল সংখ্যা চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ক্যানসার শনাক্তকরণ, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং রোগীর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা—সব ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামো থাকা জরুরি।
সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকায় জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে রোগীর চাপ বেশি। অনেক পরিবারের পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। আবার কেউ কেউ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান।
এ পরিস্থিতিতে সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করা না গেলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীদের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
শুধু মেশিন নয়, দক্ষ জনবল ও বিকেন্দ্রীকরণও জরুরি
ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে শুধু রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা যথেষ্ট নয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা, রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি এবং নিরাপদে রেডিওথেরাপি দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিয়েশন থেরাপিস্ট এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদদের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দ্রুত মেরামত, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসার চাপ কমাতে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। ঢাকার বাইরে আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা চালু করা গেলে দূরবর্তী এলাকার রোগীদের যাতায়াত ব্যয় কমবে এবং রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও কমতে পারে।
তবে নতুন চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ, মানসম্মত সেবা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
রোগীদের প্রশ্ন—চিকিৎসার অপেক্ষা আর কত দিন?
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার ঘটনা দেশের ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ছয়টি মেশিনের মধ্যে চারটি দীর্ঘদিন অকেজো থাকা, নতুন রোগীদের নিবন্ধন বন্ধ এবং হাজার হাজার রোগীর অপেক্ষমাণ তালিকা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
একদিকে সরকার ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, বর্তমানে চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের প্রয়োজন দ্রুত সেবা পাওয়া। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি তাঁদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় সময়, সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অপেক্ষমাণ রোগীদের চিকিৎসার অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিকল্প হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ তৈরি, অকেজো মেশিন দ্রুত মেরামত এবং নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।
গোপালগঞ্জের মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল কিংবা টাঙ্গাইলের সাথিয়া খাতুনের মতো রোগীদের কাছে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া শুধু একটি সেবা নয়, বরং আর্থিক সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বেঁচে থাকার আশ্রয়। তাঁদের মতো হাজারো রোগীর প্রত্যাশা—চিকিৎসার জন্য যেন বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে না হয়।
সরকারের নতুন উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং অপেক্ষমাণ রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

