গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে সহিংসতার ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার তৌফিক শেখ (২১) মারা গেছেন। সোমবার (২ নভেম্বর) শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে একদল হামলাকারীর মারধরে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।
তৌফিকের মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে তাঁর জানাজা শেষে গ্রামের বাড়িতে দাফন করার কথা জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
যেভাবে হামলার শিকার হন তৌফিক
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে গাজীপুর সদর উপজেলার পূর্ব মির্জাপুরে নোমান টেরি টাওয়েল লিমিটেড কারখানার সামনের সড়কে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে এসে তাঁরা সড়কে আন্দোলনে অংশ নেন।
এ সময় আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের কেউ কেউ কারখানার ফটক ও স্থাপনায় ভাঙচুরের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই পরিস্থিতিতে তৌফিক মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে কয়েকজন তাঁর ওপর চড়াও হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ভিডিও ধারণে বাধা দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়ার পরও তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। একপর্যায়ে তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
কে এই তৌফিক শেখ?
নিহত তৌফিক শেখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের তবি খাঁর ছেলে। ছয়ঘরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৩ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের জীবিকার তাগিদে পড়াশোনা ছেড়ে গাজীপুরে চলে আসেন তৌফিক। পরে এক বন্ধুর মাধ্যমে লায়লা গার্মেন্টসে চাকরি নেন। কর্মস্থলের কাছাকাছি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলন চলছিল। ওই আন্দোলনে তৌফিকও সক্রিয় ছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়েছে মরদেহ, বুধবার জানাজা
তৌফিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। নিহতের বড় ভাই হারুন জানান, তাঁরা ছোট ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছি। আগামীকাল বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল ১০টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাকে দাফন করা হবে।’
তৌফিকের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য না হলেও বাবার মৃত্যুর পর জীবিকার প্রয়োজনে অল্প বয়সেই তাঁকে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়েছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
পুলিশের বক্তব্য: শ্রমিকদের মারধরে আহত হন তৌফিক
ঘটনার বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ওই এলাকায় শ্রমিক আন্দোলন চলছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক করেন।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের অভিযানে তৌফিক আহত হননি। শ্রমিকরাই তাঁকে মারধর করে আহত করেছেন।
পুলিশের এই বক্তব্য অনুযায়ী, তৌফিকের ওপর হামলার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে কারা তাঁকে মারধর করেছেন, কী কারণে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
শ্রমিক আন্দোলনে সহিংসতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন চলছে। মজুরি বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন এবং শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তার দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়।
তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের মধ্যে ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও ব্যক্তিগত হামলার মতো ঘটনা শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনা শ্রমিক আন্দোলনের নিরাপত্তা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে আন্দোলনের সময় কোনো ব্যক্তি বা সাংবাদিক ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হলে তা মতপ্রকাশ ও তথ্য সংগ্রহের নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক।
একজন তরুণের এমন মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

