ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

দুই বছরে বন্ধ ৫০০-এর বেশি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা, কর্মহীন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

দুই বছরে বন্ধ ৫০০-এর বেশি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা, কর্মহীন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত বর্তমানে কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে পাঁচ শতাধিক পোশাক ও বস্ত্র কারখানা। এর ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। শিল্পপুলিশ এবং পোশাক খাতের বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য রপ্তানি (শিপমেন্ট) করতে না পারার মতো নানা কারণে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আরও বহু কারখানা বর্তমানে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

শিল্পপুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে মোট ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা, আর বাকি ২৮৭টি অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • বিজিএমইএভুক্ত ১০৮টি কারখানা,
  • বিকেএমইএভুক্ত ৩৫টি কারখানা,
  • বিটিএমএভুক্ত ৮টি কারখানা এবং
  • বেপজার অধীন ১৯টি কারখানা।

তবে শিল্পপুলিশের তথ্যের সঙ্গে বিজিএমইএর তথ্যের কিছু পার্থক্য রয়েছে। সংগঠনটির দাবি, গত দুই বছরে তাদের সদস্যভুক্ত ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই বন্ধ হয়েছে ১৪১টি, আর ২০২৪ সালে বন্ধ হয় ৭৭টি। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিজিএমইএর সদস্য কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১২৭টি।

খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের কারণে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে চাহিদা কমেছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ বাড়লেও সে সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও সীমিত সংখ্যক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ শিল্পখাতকে আরও সংকটে ফেলেছে। তাঁর মতে, বর্তমান সরকার কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর বাস্তব ফল পেতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার সংকটে রয়েছে। ফলে কয়েকটি বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিগত সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যের ধারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক বিক্রয় ও সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক বিপণন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

এদিকে সরকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন উদ্যোক্তারা।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, বৈশ্বিক বাজারে এখনো পোশাকের চাহিদা প্রবৃদ্ধিমুখী। সঠিক নীতিগত সহায়তা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না হলেও ভবিষ্যতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্য অর্জন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!