বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করা এবং আর্থিক সংকটে থাকা বা বন্ধ কারখানাগুলোতে নতুন মূলধন ও আধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে সংগঠনটি।
এ লক্ষ্যে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ (ওকাইব)-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিজিএমইএর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই পক্ষ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
বিনিয়োগ বাড়াতে তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলবে বিজিএমইএ
বৈঠকে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, দেশের অনেক পোশাক কারখানা বর্তমানে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন কিংবা কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রয়োজন অনুভব করছে। এসব কারখানার তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে সংরক্ষণ করে সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি জানান, বিজিএমইএর সদস্য কারখানাগুলোর কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য চাওয়া হবে। যেসব উদ্যোক্তা তাদের সচল বা বন্ধ কারখানায় চীনা মূলধন ও প্রযুক্তি যুক্ত করতে আগ্রহী অথবা শতভাগ মালিকানা বা শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে যৌথ অংশীদার খুঁজছেন, তারা কারখানার অবস্থান, আয়তন, উৎপাদন সক্ষমতা, যন্ত্রপাতি, শ্রমিক সংখ্যা, আর্থিক অবস্থা এবং প্রত্যাশিত অংশীদারিত্বের ধরনসহ বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে পারবেন।
চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, তবে তথ্যের ঘাটতি বড় বাধা
ওকাইবের প্রতিনিধিরা জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী উপস্থিতি চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
তবে তাদের মতে, অনেক সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ প্রকল্প সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে চীনা উদ্যোক্তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এ কারণে তারা বিজিএমইএর সহযোগিতায় একটি তথ্যভিত্তিক সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।
বন্ধ কারখানায় নতুন প্রাণ ফেরানোর পরিকল্পনা
বিজিএমইএর কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশের কিছু পোশাক কারখানা আর্থিক সংকট, অর্ডার স্বল্পতা কিংবা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
চীনা বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে এসব কারখানার একটি বড় অংশ পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে নতুন গতি
বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়নের বিষয়টি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুতা, কাপড়, ডাইং, ফিনিশিং, অ্যাক্সেসরিজ ও টেক্সটাইল কেমিক্যালসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প আরও শক্তিশালী করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।
চীনা বিনিয়োগকারীরা এসব খাতে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও শিল্প সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগকারীদের কাছে উপস্থাপন
বিজিএমইএ জানিয়েছে, সদস্য কারখানাগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, অবকাঠামো, উৎপাদন সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হবে।
এরপর যাচাইকৃত তথ্য ওকাইবের মাধ্যমে সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে, যাতে তারা বাস্তবভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
দীর্ঘমেয়াদে যে সুফল মিলতে পারে
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
বন্ধ ও আর্থিক সংকটে থাকা কারখানার পুনরুজ্জীবন।
নতুন বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন দক্ষতার উন্নয়ন।
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সম্প্রসারণ।
উচ্চমূল্য সংযোজিত (ভ্যালু-অ্যাডেড) পোশাক উৎপাদন বৃদ্ধি।
বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়া।
প্রস্তাব পাঠানোর আহ্বান
বিজিএমইএ আগ্রহী কারখানা মালিক এবং সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নির্ধারিত ই-মেইল ঠিকানায় তাদের বিস্তারিত প্রস্তাব ও তথ্য পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির আশা, দেশীয় উদ্যোক্তা ও চীনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে উঠলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে এবং বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।

