বিডা-বেজা-পিপিপিএ বিলুপ্ত, একীভূত হয়ে যাত্রা শুরু ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের’ | বিনিয়োগ অনুমোদনে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ। দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের এক ছাতার নিচে সমন্বিত সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কার্যকর হয়েছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’। নতুন এই আইনের মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে গত ১৬ জুলাই ২০২৬ আইনটি পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। পরে সরকারের জারি করা বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০ আগস্ট থেকে সারা দেশে আইনটি কার্যকর করা হয়।
নতুন আইন কার্যকরের মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের পৃথক কার্যক্রমের পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এর ফলে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে সেবা নেওয়ার প্রবণতা কমবে এবং বিনিয়োগের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে।
চারটি আইন বাতিল
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ খাতের আগের চারটি আইন বাতিল করা হয়েছে। এগুলো হলো—বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৬; বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, ২০১০; বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আইন, ২০১৫ এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন, ২০১৮।
এসব আইনের আওতায় পরিচালিত বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম এখন নতুন আইনের অধীনে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে।
বিলুপ্ত তিন সংস্থা, একীভূত হলো কার্যক্রম
নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) বিলুপ্ত করা।
এই তিন প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রম, সম্পদ, দায়-দেনা, চুক্তি, মামলা-মোকদ্দমা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন কাঠামোর আওতায় একীভূত করা হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে দেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় নতুন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ (আইবি)। প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রধান ও সমন্বিত বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গভর্নিং বোর্ড
নতুন আইনের অধীনে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের’ সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা হিসেবে থাকবে একটি গভর্নিং বোর্ড। এই বোর্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
বোর্ডে অর্থ, শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, ভূমি এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং বেসরকারি খাতের চারজন প্রতিনিধিও বোর্ডে থাকবেন। বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে অন্তত দুজন নারী থাকার বিধান রাখা হয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয় বাড়ানোই এ কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য।
চেয়ারম্যান ও সাত সদস্যে পরিচালিত হবে দৈনন্দিন কার্যক্রম
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের’ সার্বক্ষণিক প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য থাকবেন একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য। তারা বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সেবা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, অনুমোদন প্রক্রিয়ার সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করবেন।
এর ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা কমবে বলে আশা করছে সরকার।
এক ছাতার নিচে বিনিয়োগসেবা
বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদন, ছাড়পত্র ও সেবা নিতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ এবং প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। একটি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে হয় বিনিয়োগকারীদের।
নতুন আইনের লক্ষ্য হলো এসব সেবা একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নিবন্ধন, লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে ওয়ান-স্টপ বা একক সেবা কাঠামোকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকার মনে করছে, প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমানো গেলে বিনিয়োগকারীদের সময় ও ব্যয় দুটোই কমবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আস্থা বাড়বে।
বিনিয়োগ বাড়ানোর বড় প্রত্যাশা
বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং স্থানীয় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা, ভূমি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্রকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।
নতুন আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে আন্তঃসংস্থার সমন্বয় বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে শুধু প্রতিষ্ঠান একীভূত করলেই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন কর্তৃপক্ষের কার্যকর নেতৃত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমন্বয় কতটা নিশ্চিত করা যায়—তার ওপরই নতুন কাঠামোর সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার ফলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন কমিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হলো। এখন এই কাঠামো বাস্তবে কতটা দ্রুত ও বিনিয়োগকারীবান্ধব সেবা দিতে পারে, সেটিই হবে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষের সামনে বড় পরীক্ষা।

