দেশের তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিককে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনতে যৌথভাবে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘমেয়াদে পোশাক শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অবসরকালীন জীবনকে সুরক্ষিত করতেই এ উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট নেতারা।
তাদের মতে, দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমনির্ভর শিল্পগুলোর একটি তৈরি পোশাক খাত। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দীর্ঘ সময় এ খাতে কাজ করলেও অবসর-পরবর্তী সময়ে তাদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় পোশাক শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে তাদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা বাড়বে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের নুরুল কাদের অডিটরিয়ামে আয়োজিত ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিষয়ক আলোচনা সভায়’ এসব কথা উঠে আসে।
সভায় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ও বিজিএমইএর নেতারা পোশাক শ্রমিকদের পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার বিভিন্ন দিক, অংশগ্রহণ বাড়ানোর কৌশল এবং বাস্তবায়নের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন।
পেনশন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য শেখ কামরুল হাসান। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও বার্ধক্যে নাগরিকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সরকার সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করেছে।
তার মতে, একটি টেকসই পেনশন ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে শ্রমনির্ভর খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মীকে এর আওতায় আনতে পারলে এর সামাজিক প্রভাব হবে ব্যাপক।
১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের অংশগ্রহণের সুযোগ
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী নাগরিকরা এ স্কিমে অংশ নিতে পারবেন এবং ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে নিয়মিত পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, কোনো গ্রাহক পেনশন গ্রহণের বয়সে পৌঁছানোর আগে মারা গেলে মনোনীত ব্যক্তি জমাকৃত অর্থ ও মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে আর্থিক অসুবিধার সময় গ্রাহকের চাঁদার পরিমাণ সমন্বয়ের সুযোগও রয়েছে।
ফলে কর্মজীবনে নিয়মিত সঞ্চয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা তৈরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে সভায় তুলে ধরা হয়।
এডিবির অর্থায়নে ১০০ মিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ
সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, পেনশন ব্যবস্থার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি এর কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে দেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শ্রমনির্ভর খাতগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পোশাক খাতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক থাকায় এ খাতকে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা হলে পেনশন ব্যবস্থার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
১০০ জনের বেশি শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানে পেনশন হিসাবের উদ্যোগ
সভায় শ্রম আইন ২০২৬-এর সংশোধনী প্রসঙ্গও উঠে আসে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, ১০০ জনের বেশি শ্রমিক কর্মরত এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের পেনশন স্কিমের আওতায় আনার বিধান রয়েছে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রমিকদের জন্য পেনশন হিসাব খোলার উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানানো হয়।
তৈরি পোশাক শিল্পে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক থাকায় এ বিধান বাস্তবায়নে বিজিএমইএর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি, শ্রমিকদের নিবন্ধন এবং নিয়মিত চাঁদা প্রদানের ব্যবস্থা কার্যকর করা—এসব বিষয়কে বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সব পোশাক শ্রমিককে দ্রুত পেনশনের আওতায় আনার দাবি
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পোশাক খাতের সব শ্রমিককে দ্রুত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন।
তিনি শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রথম দুই বছরের জন্য সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। পাশাপাশি পোশাক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
তার মতে, শ্রমিকদের মধ্যে পেনশন ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে শ্রমিকরা নতুন ব্যবস্থায় সহজে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সুবিধা সম্পর্কে আস্থা পাবেন।
৫০ লাখ শ্রমিককে যুক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ
বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, প্রায় ৫০ লাখ পোশাক শ্রমিককে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে তা ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করা বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে তিনি এটিকে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনতে হলে সরকার, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ, বিজিএমইএ এবং পোশাক কারখানা মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং পেনশন ব্যবস্থার সুবিধা সহজভাবে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
মুনাফার হার গুরুত্বপূর্ণ
বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সম্ভাব্য মুনাফার হার শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের এই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে বিজিএমইএ সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবে। পেনশনের সুবিধা, চাঁদার পরিমাণ, ভবিষ্যৎ প্রাপ্তি এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শ্রমিকদের পরিষ্কার ধারণা দেওয়া গেলে অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাস্তবায়নে সচেতনতা ও আস্থাই বড় বিষয়
পোশাক শ্রমিকদের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু নিবন্ধন করানোই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত চাঁদা প্রদান, শ্রমিকের কর্মস্থল পরিবর্তনের পর হিসাব সচল রাখা এবং পেনশন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কারখানা কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন, বিজিএমইএ এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা গেলে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে চাঁদার কাঠামো ও সরকারি প্রণোদনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিককে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ সফল হলে এটি শুধু শ্রমিকদের অবসরকালীন নিরাপত্তাই বাড়াবে না, বরং দেশের সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোকেও আরও বিস্তৃত করতে পারে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবায়নে নিয়ে গিয়ে শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

