ঢাকা রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের এক বছর, ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ০৯:৫২ এএম

শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের এক বছর, ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ

ছবিঃ সংগৃহীত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ রবিবার (১৮ অক্টোবর)। গত বছরের এই দিনে আগুনে পুড়ে যায় হাজার কোটি টাকার পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি। ঘটনার পর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ১৪ দফা সুপারিশ করা হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব সুপারিশের বেশির ভাগ বাস্তবায়নের পথে। নেওয়া হয়েছে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত টহল, প্রশিক্ষণ ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার উদ্যোগ। তবে আমদানিকারকদের দাবি, কার্গো ব্যবস্থাপনায় এখনও ঝুঁকি রয়েছে। নতুন কার্গো কমপ্লেক্সও পুরোপুরি চালু হয়নি।

গত বছরের ১৮ অক্টোবর দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটসংলগ্ন কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। বিজিবিও উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে অংশ নেয়। ওই দিন রাত ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হয়। তবে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে ১৯ অক্টোবর বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে চলে আগুন নেভানোর কাজ। এ ঘটনায় ২৫ জন আনসারসহ মোট ৩৫ জন আহত হন। পুড়ে যায় হাজার কোটি টাকার পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি।

ঘটনার পর বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি কার্গোসহ পুরো বিমানবন্দর এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ১৪টি সুপারিশ করে। এসব সুপারিশের মধ্যে ছিল অস্থায়ী ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন, ফায়ার হাইড্রেন্ট ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থা চালু, জরুরি সংকেত স্থাপন, ফায়ার বক্সসহ হোস পাইপ বসানো, অচল ফায়ার হাইড্রেন্ট মেরামত, স্থায়ী ফায়ার স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ এবং অগ্নিনিরাপত্তা অবকাঠামো ও জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো।


এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মাধ্যমে ফায়ার ক্রুদের প্রশিক্ষণ, ভূমি অধিগ্রহণের দলিল সংগ্রহ, বিমান বাহিনীর সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি আধুনিকায়ন এবং কেন্দ্রীয় ফুয়েল শেডের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশও করা হয়। জেনারেল এভিয়েশন হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সে ফায়ার হাইড্রেন্ট, স্প্রিংকলার ও ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপনের পাশাপাশি এমটিপুল, সেমসু ও সিএটিসির চারটি পয়েন্টে ফায়ার বক্সসহ হোস পাইপ বসানোর কথা বলা হয়। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাতটি অচল ফায়ার হাইড্রেন্ট মেরামত এবং ফায়ার সার্ভিসের অস্থায়ী স্টেশনের গাড়ি রাখার শেড নির্মাণের বিষয়ও ছিল সুপারিশে।

আমদানিকারকদের দাবি, ঝুঁকি রয়ে গেছে

শাহজালাল বিমানবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম ভূঁইয়া মিঠু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আমদানিকারকদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এমনকি ওই ঘটনার পর এ বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তারপরও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমদানিকারকেরা পণ্য আমদানি করছেন।

তিনি বলেন, নতুন কার্গো কমপ্লেক্স এখনও চালু হয়নি। অত্যাধুনিক এই কমপ্লেক্স চালু হলে শেডের ভেতরে ও বাইরে মালামাল পড়ে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এভাবে মালামাল পড়ে থাকলে পণ্যের ক্ষতির পাশাপাশি অগ্নিঝুঁকিও থাকে।

শাহজালালে অগ্নিকাণ্ড ২০২৫ 1
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ড। ফাইল ছবি

অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে গত এক বছরে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন খায়রুল আলম। তিনি বলেন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিজেদের দিক থেকে যেসব কাজ করেছে, সেগুলো হয়তো তাদের বিবেচনায় ঠিক আছে। তবে কার্গো ব্যবস্থাপনায় এখনও ঝুঁকি রয়েছে বলে তারা মনে করেন।

বিমান বলছে, উন্নতি হয়েছে

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক কার্গো (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাশিদুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পুরো এলাকা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও বেশ কিছু বিষয়ে উন্নতি হয়েছে। কয়েকটি গেট তৈরি করা হয়েছে। এসব গেট দিয়ে দ্রুত মালামাল খালাস করা যাচ্ছে। এ ছাড়া কার্গো কমপ্লেক্সের একটি অংশ ব্যবহার শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে নেওয়া ব্যবস্থাগুলো ভালো। সামনে এ বিষয়ে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এখন মালামাল খালাসে আগের মতো সময় লাগছে না। সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে মালামাল সরবরাহ করছেন।

সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতির দাবি

বেবিচকের সদস্য (প্ল্যানিং অ্যান্ড অপারেশনস) মেহবুব খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত বছরের অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছিল। ওই বৈঠকের প্রায় সব সুপারিশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে।

তিনি বলেন, কার্গো এলাকার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়গুলো দেখভাল করবে বিমান ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। বেবিচক তাদের জায়গা লিজ দিয়েছে। তারা নিজেদের দুর্বলতা দূর না করলে দুর্ঘটনার দায়ও তাদের বহন করতে হবে।

বেবিচকের ফায়ার সেফটি বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ভয়াবহ ওই ঘটনার পর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ব্যাপক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি অফিসের বৈদ্যুতিক তার ঢিলা আছে কিনা, শর্ট সার্কিট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না; এসব যাচাই করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ফায়ার সেফটি প্ল্যান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে জমা দেওয়া হয়েছে। ওই পরিকল্পনায় স্মোক ডিটেক্টর ও অ্যালার্মিং সিস্টেম রয়েছে। কোনো ধরনের ধোঁয়া শনাক্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে উঠবে। এ ছাড়া প্রতিদিন ভোর, সকাল ও রাতে টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

বেবিচকের মুখপাত্র কাওছার মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর এলাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে বিভিন্ন অফিসে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি উদ্ধার মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে। এ ছাড়া টার্মিনাল ভবন এলাকায় কর্মরত ১ হাজার ৯০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে অগ্নিনিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ব্যবহার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

বিমানবন্দরের সার্বিক অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিনেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকে, যাতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা তদারকি, সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা যায়।হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ রোববার (১৮ অক্টোবর)। গত বছরের এই দিনে বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় বিপুল পরিমাণ আমদানি করা পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হলেও, ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য ও নথির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ঘটনার পর বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে তদন্ত কমিটি ১৪ দফা সুপারিশ করে। এর মধ্যে ছিল ফায়ার হাইড্রেন্ট ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থা সচল করা, অগ্নিসংকেত ও শনাক্তকরণব্যবস্থা স্থাপন, ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নিয়মিত টহল, অগ্নিনির্বাপণ মহড়া, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

তবে আমদানিকারকদের অভিযোগ, এক বছর পার হলেও কার্গো ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। নতুন কার্গো কমপ্লেক্সও এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে পণ্য সংরক্ষণ, দ্রুত খালাস এবং অগ্নিঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতির কথা বললেও বাস্তবে ঝুঁকি কতটা কমেছে, তা নিয়ে ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে।

২৭ ঘণ্টার আগুনে বিপর্যস্ত হয়েছিল কার্গো ভিলেজ

গত বছরের ১৮ অক্টোবর দুপুর সোয়া ২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটসংলগ্ন কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়লে সেখানে থাকা পণ্য ও নথি রক্ষায় ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট কাজ করে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে অংশ নেয়।

দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ওই দিন রাত ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হয়। তবে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে পরদিন ১৯ অক্টোবর বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে আগুন নেভানোর কাজ চলে।

এ ঘটনায় ২৫ জন আনসার সদস্যসহ মোট ৩৫ জন আহত হন। আগুনে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি পুড়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বলে উল্লেখ করা হলেও, ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের চূড়ান্ত আর্থিক মূল্য, পণ্যভিত্তিক ক্ষতির হিসাব এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কার্গো ভিলেজের এই অগ্নিকাণ্ড বিমানবন্দরের পণ্য সংরক্ষণ, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধার এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে আমদানি করা পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে।

অগ্নিনিরাপত্তায় ১৪ দফা সুপারিশ

অগ্নিকাণ্ডের পর বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারের জন্য ১৪ দফা সুপারিশ করে।

সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অস্থায়ী ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন, ফায়ার হাইড্রেন্ট ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থা চালু করা, জরুরি সংকেতব্যবস্থা স্থাপন, ফায়ার বক্সসহ হোস পাইপ বসানো এবং অচল ফায়ার হাইড্রেন্ট মেরামত করা। পাশাপাশি স্থায়ী ফায়ার স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ, অগ্নিনিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মাধ্যমে ফায়ার ক্রুদের প্রশিক্ষণ, ভূমি অধিগ্রহণের দলিল সংগ্রহ, বিমানবাহিনীর সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি আধুনিকায়ন এবং কেন্দ্রীয় ফুয়েল শেডের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়।

জেনারেল এভিয়েশন হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সে ফায়ার হাইড্রেন্ট, স্প্রিংকলার ও অগ্নিকাণ্ড শনাক্তকরণব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়টিও সুপারিশে ছিল। একই সঙ্গে এমটিপুল, সেমসু ও সিএটিসির চারটি পয়েন্টে ফায়ার বক্সসহ হোস পাইপ স্থাপনের কথা বলা হয়।

সুপারিশে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাতটি অচল ফায়ার হাইড্রেন্ট মেরামত এবং ফায়ার সার্ভিসের অস্থায়ী স্টেশনের গাড়ি রাখার শেড নির্মাণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব সুপারিশের লক্ষ্য ছিল শুধু অগ্নিকাণ্ডের পর আগুন নেভানোর ব্যবস্থা জোরদার করা নয়, বরং আগুনের সূত্রপাত দ্রুত শনাক্ত করা, আগুন ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা বাড়ানো।

তবে ১৪ দফা সুপারিশের কোনটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি চলমান এবং কোনটি এখনো অসম্পূর্ণ—এ বিষয়ে সুপারিশভিত্তিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা আরও স্পষ্ট হতো।

আমদানিকারকদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ মেলেনি

শাহজালাল বিমানবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম ভূঁইয়া মিঠু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকেরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পর এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমদানিকারকেরা পণ্য আমদানি অব্যাহত রেখেছেন।

নতুন কার্গো কমপ্লেক্স পুরোপুরি চালু না হওয়াকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, অত্যাধুনিক কার্গো কমপ্লেক্স চালু হলে পণ্য ব্যবস্থাপনা ও খালাসের প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল হতো। শেডের ভেতরে ও বাইরে পণ্য পড়ে থাকার পরিস্থিতি কমত। দীর্ঘ সময় পণ্য বাইরে বা অনুপযুক্ত স্থানে পড়ে থাকলে ক্ষতির আশঙ্কার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।

খায়রুল আলমের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের পর এক বছরে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন রয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিজেদের অবস্থান থেকে কিছু কাজ করে থাকতে পারে; তবে কার্গো ব্যবস্থাপনায় এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে তাঁরা মনে করেন।

আমদানিকারকদের এসব অভিযোগের মধ্য দিয়ে তিনটি বিষয় সামনে এসেছে—ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ, নতুন কার্গো কমপ্লেক্সের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু এবং পণ্য সংরক্ষণ ও খালাসের ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দাবি, কার্গো ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হয়েছে

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক (কার্গো) অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা রাশিদুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পুরো এলাকাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। কয়েকটি গেট তৈরি করা হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খালাস করা যাচ্ছে। এ ছাড়া কার্গো কমপ্লেক্সের একটি অংশ ব্যবহার শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ থাকতে পারে; তবে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো কার্যকর। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, বর্তমানে পণ্য খালাসে আগের মতো সময় লাগছে না এবং সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে পণ্য সরবরাহের কাজ করছেন।

বিমানের পক্ষ থেকে কার্গো ব্যবস্থাপনায় উন্নতির কথা বলা হলেও নতুন কমপ্লেক্সের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু, পণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা এবং অগ্নিনিরাপত্তার বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে আমদানিকারকদের উদ্বেগ রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতির পরিমাপযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আস্থা বাড়তে পারে।

বেবিচকের দাবি, অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্ল্যানিং অ্যান্ড অপারেশনস) মেহবুব খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছিল। ওই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও সুপারিশের প্রায় সবই বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।

তিনি বলেন, কার্গো এলাকার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্ব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর। বেবিচক তাদের জায়গা লিজ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দুর্বলতা দূর না করলে দুর্ঘটনার দায়ও তাদের বহন করতে হবে।

তাঁর বক্তব্যে কার্গো এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে অগ্নিনিরাপত্তা একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হওয়ায় অবকাঠামো, সরঞ্জাম, জনবল, নিয়মিত পরিদর্শন ও জরুরি সাড়াদান—সব ক্ষেত্রেই দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, ধোঁয়া শনাক্তকরণ ও নিয়মিত টহল

বেবিচকের ফায়ার সেফটি বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অফিসের বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ ঢিলা কি না, শর্ট সার্কিটের আশঙ্কা রয়েছে কি না—এসব বিষয় পরীক্ষা করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ফায়ার সেফটি প্ল্যান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে জমা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় স্মোক ডিটেক্টর ও অ্যালার্মিং সিস্টেমের ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও ধোঁয়া শনাক্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে ওঠার কথা। পাশাপাশি প্রতিদিন ভোর, সকাল ও রাতে টহল পরিচালনা করা হচ্ছে।

অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, ধোঁয়া শনাক্তকরণব্যবস্থা এবং নিয়মিত টহল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা কতটি স্থানে কার্যকরভাবে চালু হয়েছে, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হচ্ছে এবং জরুরি সংকেত পাওয়ার পর কত দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব—এসব বিষয়ও অগ্নিনিরাপত্তার কার্যকারিতা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।

দুটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট, প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ১,৯০০ জনের বেশি

বেবিচকের মুখপাত্র কাওছার মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অগ্নিনিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর এলাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি জানান, অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে বিভিন্ন অফিসে অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি উদ্ধার মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে। টার্মিনাল ভবন এলাকায় কর্মরত ১ হাজার ৯০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে অগ্নিনিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ব্যবহার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

বেবিচকের মুখপাত্র আরও বলেন, বিমানবন্দরের সার্বিক অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিনেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এক বছর পরও বড় প্রশ্ন: কতটা নিরাপদ কার্গো ভিলেজ?

কার্গো ভিলেজের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে। ফায়ার সার্ভিস ইউনিট স্থাপন, ফায়ার হাইড্রেন্ট বসানো, নিয়মিত টহল, প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মতো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব কার্যকারিতা যাচাই করাও সমান জরুরি।

বিশেষ করে তদন্ত কমিটির ১৪ দফা সুপারিশের বাস্তবায়ন-অবস্থা, নতুন কার্গো কমপ্লেক্সের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর সময়সীমা, পণ্য সংরক্ষণ ও খালাসের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো এখনো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু সরঞ্জাম স্থাপন বা প্রশিক্ষণের আয়োজন যথেষ্ট নয়; নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকর নজরদারি, জরুরি সাড়াদানের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পূর্তিতে তাই মূল প্রশ্ন—গৃহীত উদ্যোগগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কার্গো ভিলেজে আগুন লাগলে এবার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে?

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!