ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

শাহজালালে যাত্রীর শরীরে মিলল স্বর্ণের ‘ডিম’

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম

শাহজালালে যাত্রীর শরীরে মিলল স্বর্ণের ‘ডিম’

ছবিঃ সংগৃহীত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক যাত্রীর পায়ুপথে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা সাদা টেপে মোড়ানো তিনটি ডিম্বাকৃতির স্বর্ণের পেস্ট উদ্ধার করেছে ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ টিম। উদ্ধার করা তিনটি পেস্টের মোট ওজন ১ কেজি ২৯০ গ্রাম। কাস্টমসের হিসাবে এগুলো পরিশোধন করলে প্রায় ১ কেজি খাঁটি স্বর্ণ পাওয়া যেতে পারে। উদ্ধার করা স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।

শারজাহ থেকে আসা ফ্লাইটে ঢাকায়

কাস্টমসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে এয়ার আরাবিয়ার জি-৯-৫১৮ ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

স্বর্ণ পাচারের সম্ভাব্য তথ্যের ভিত্তিতে ওই সময় বিমানবন্দরের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে নজরদারি চালাচ্ছিল ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ টিম।

ব্যাগেজ বেল্টে সন্দেহজনক আচরণ

একপর্যায়ে আরমান উদ্দিন সিদ্দিকী নামের এক যাত্রী ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে ব্যাগেজ বেল্ট-২ এলাকায় আসেন। সেখানে তার চলাফেরা ও আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ টিম তাকে নজরদারিতে নেয়।

পরে কাস্টমস কর্মকর্তারা তার শরীরে তল্লাশি চালান। তল্লাশির একপর্যায়ে তার পায়ুপথে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা সাদা টেপে মোড়ানো তিনটি ডিম্বাকৃতির বস্তু পাওয়া যায়।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রাথমিক পরীক্ষায় সেগুলো স্বর্ণের পেস্ট বলে শনাক্ত হয়।

তিনটি পেস্টের ওজন ১ কেজি ২৯০ গ্রাম

কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া প্রতিটি ডিম্বাকৃতির স্বর্ণের পেস্টের ওজন ৪৩০ গ্রাম। তিনটি পেস্টের মোট ওজন দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯০ গ্রাম বা ১ দশমিক ২৯ কেজি।

কাস্টমসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উদ্ধার করা স্বর্ণের পেস্টের বিশুদ্ধতা ২৪ ক্যারেট।

তবে পেস্ট আকারে থাকায় পুরো ১ কেজি ২৯০ গ্রামকে সমপরিমাণ খাঁটি স্বর্ণ হিসেবে ধরা হচ্ছে না। স্বর্ণকারের প্রত্যয়ন অনুযায়ী, এগুলো পরিশোধন করলে প্রায় ১ কেজি খাঁটি স্বর্ণ পাওয়া যেতে পারে।

বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা

কাস্টমসের হিসাবে উদ্ধার করা স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। বিপুল মূল্যমানের এই স্বর্ণ কীভাবে দেশে আনা হয়েছে এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয় রয়েছে।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, স্বর্ণের প্রকৃত উৎস, দেশে আনার উদ্দেশ্য এবং পাচারচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তদন্ত করা হবে।

তথ্যের ভিত্তিতে বাড়ানো হয় নজরদারি

স্বর্ণ পাচারের তথ্য পাওয়ার পর থেকেই বিমানবন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি জোরদার করেছিল প্রিভেন্টিভ টিম। ইমিগ্রেশন এলাকা পেরিয়ে ব্যাগেজ বেল্টে পৌঁছানোর পর সন্দেহভাজন যাত্রীর আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তাকে তল্লাশির আওতায় আনা হয়।

এরপরই বিশেষ কৌশলে শরীরে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণের পেস্টের সন্ধান পাওয়া যায়।

এ ধরনের ঘটনায় কাস্টমসের গোয়েন্দা তথ্য, যাত্রীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পায়ুপথে স্বর্ণ পাচারের কৌশল

স্বর্ণ চোরাচালানে পাচারকারীরা বিভিন্ন সময় শরীরের ভেতরে বা শরীরের বিভিন্ন অংশে মূল্যবান ধাতু লুকিয়ে পরিবহনের চেষ্টা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে তিনটি ডিম্বাকৃতির পেস্ট সাদা টেপ দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় পায়ুপথে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বলে কাস্টমস জানিয়েছে।

তল্লাশিতে এমন স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় পাচারকারীরা কীভাবে নিরাপত্তা ও কাস্টমস নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, সেটিও তদন্তের অংশ হতে পারে।

ফৌজদারি মামলা দায়েরের কার্যক্রম

এ ঘটনায় যাত্রী আরমান উদ্দিন সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ টিমের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের কার্যক্রম চলছে বলে এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

মামলার পর তদন্তে স্বর্ণের উৎস, পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা চক্র এবং দেশে আনার পেছনে অর্থনৈতিক লেনদেনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় সামনে আসতে পারে।

বিমানবন্দরে কাস্টমসের নজরদারি

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ। প্রতিদিন বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক যাত্রী বাংলাদেশে আসেন। এর মধ্যে স্বর্ণ, মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য চোরাচালান ঠেকাতে কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি আরও কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহার করে দেশে স্বর্ণ পাচারের চেষ্টা প্রতিহত করা সম্ভব হবে।

এক নজরে উদ্ধার করা স্বর্ণ
উদ্ধারের স্থান: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
উদ্ধারকারী সংস্থা: ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ টিম
যাত্রী: আরমান উদ্দিন সিদ্দিকী
ফ্লাইট: এয়ার আরাবিয়া জি-৯-৫১৮
উৎপত্তিস্থল: শারজাহ, সংযুক্ত আরব আমিরাত
স্বর্ণের আকৃতি: তিনটি ডিম্বাকৃতির পেস্ট
প্রতিটির ওজন: ৪৩০ গ্রাম
মোট ওজন: ১ কেজি ২৯০ গ্রাম
বিশুদ্ধতা: ২৪ ক্যারেট
পরিশোধনের পর সম্ভাব্য খাঁটি স্বর্ণ: প্রায় ১ কেজি
আনুমানিক বাজারমূল্য: প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা
আইনি ব্যবস্থা: ফৌজদারি মামলা দায়েরের কার্যক্রম চলছে
পাচার ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারির গুরুত্ব

শাহজালালে বিপুল মূল্যমানের স্বর্ণ উদ্ধারের এই ঘটনা আবারও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে চোরাচালানবিরোধী নজরদারির গুরুত্ব সামনে এনেছে। বিশেষ করে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যাত্রীদের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সন্দেহজনক আচরণ শনাক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তল্লাশি পরিচালনা করলে চোরাচালানের চেষ্টা প্রতিহত করা সম্ভব।

তবে এই ঘটনায় স্বর্ণের প্রকৃত মালিক, পাচারের উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত ও মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!