ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ৭

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ৭

ছবিঃ সংগৃহীত

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এ ছাড়া একজন চাকরিপ্রত্যাশীও গ্রেপ্তার হয়েছেন।

এসআরবির দাবি, প্রাথমিক তদন্তে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর তৈরি এবং বিভিন্ন পরীক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। চক্রটির সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় আর্থিক লেনদেনের তথ্যও পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।

৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থীর পরীক্ষা স্থগিত

এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগের জন্য গত ১০ অক্টোবর বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী।

পরীক্ষা সকাল ১১টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে। নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসায় বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

ঘটনার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ ও অভিযান চালিয়ে ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা রয়েছেন

এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—

১. পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩)।
২. চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩)।
৩. মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২)।
৪. এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫)।
৫. প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩)।
৬. এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০)।
৭. এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তবে তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ভূমিকা ও সম্পৃক্ততার মাত্রা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।

চার ধাপে গ্রেপ্তার, মোবাইল ফোনের চ্যাটে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

এসআরবির তথ্যমতে, গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার সূত্র পান।

এরপর উত্তরখান ও মিরপুর-১০ এলাকা থেকে এস এম ইমদাদুল ইসলাম ও আসাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৫ অক্টোবর সাভার থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এসআরবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, আদান-প্রদান এবং উত্তর তৈরির সময় সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস ও পুরো প্রক্রিয়া শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি, পরে তৈরি হয় উত্তর

সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন দাবি করেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও বিতরণের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নূর মোহাম্মদ গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটের দিকে একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান বলে জানিয়েছে এসআরবি। পরে চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে প্রশ্ন ও উত্তর বিভিন্ন পরীক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে।

এ কাজে রুবেল, মফিজুল, সুজন ও আসাদুলের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে প্রশ্নপত্রের উৎস, প্রতিটি ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এবং কতজন পরীক্ষার্থী প্রশ্ন বা উত্তর পেয়েছিলেন—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে আরও নিশ্চিত করতে হবে।

১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার দাবি

এসআরবি-৩-এর অধিনায়কের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে রুবেল ইসলাম ও মফিজুল ইসলামের মাধ্যমে চক্রটির আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

এসআরবির দাবি, মফিজুল নিজেও একজন চাকরিপ্রত্যাশী। তিনি চক্রের একজনকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছিলেন বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের উল্লেখ করেন অধিনায়ক। পরে বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় মফিজুল চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের সময় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অর্থ লেনদেনের প্রকৃতি, টাকার প্রকৃত উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অর্থের আদান-প্রদানের পূর্ণ বিবরণ এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিপুল পরিমাণ নথি ও মোবাইল ফোন জব্দ

অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের নথি, ব্যাংকের চেক, প্রবেশপত্র, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা জব্দ করেছে এসআরবি।

সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জব্দ করা আলামতের মধ্যে রয়েছে—

১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প।
৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প।
প্রশ্নপত্রের এক সেট।
বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা।
১০টি সার্টিফিকেট এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও ১৫টি সনদপত্র।
বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা এবং একটি ব্যাংক চেক।
ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র।
আটটি মোবাইল ফোন।
নগদ চার হাজার টাকা।

তদন্তকারীদের ধারণা, জব্দ করা মোবাইল ফোন ও নথিপত্র প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব আলামতের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ও যাচাইয়ের ফল তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।

প্রশ্নফাঁসের উৎস ও অন্য সহযোগীদের খুঁজছে এসআরবি

এসআরবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, এর সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং প্রশ্ন ও উত্তর কতজনের কাছে পৌঁছেছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে চক্রটির আর্থিক লেনদেন এবং অন্য কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

এ ঘটনায় সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর অংশগ্রহণের কথা থাকায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে গ্রেপ্তার হওয়া মানেই কোনো ব্যক্তি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন নয়। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, জব্দ করা আলামত এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!