ক্ষমতার পালাবদল হয়, বদলে যায় রাজনৈতিক সমীকরণ। কিন্তু পাড়া-মহল্লায় অপরাধের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য ধরে রাখার ‘বড়ভাই’ সংস্কৃতির অবসান হচ্ছে না। রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় প্রভাব ও অর্থনৈতিক স্বার্থের আড়ালে কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোথাও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া, কোথাও ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার, আবার কোথাও জমি দখল, হামলা কিংবা হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর ও তরুণেরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও এই অপরাধপ্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কিশোর গ্যাংয়ের দৃশ্যমান সদস্যদের পাশাপাশি নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষক ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন আর শুধু রাজধানী ঢাকার কয়েকটি পাড়া-মহল্লায় সীমাবদ্ধ নেই। বিভাগীয় শহর থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে এ ধরনের অপরাধী গোষ্ঠীর কার্যক্রম। বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, চাঁদা আদায়, ছিনতাই, মাদক পরিবহন ও বিক্রিসহ নানা অপরাধে কিশোর ও তরুণদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে তালিকাভুক্ত সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে ১১৮ থেকে বেড়ে ১৫৯টিতে দাঁড়িয়েছে। এসব গ্যাংয়ের পেছনে শতাধিক পৃষ্ঠপোষকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে বলেও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধজগতের পরিচিত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে তালিকাভুক্তি বা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ মানেই কারও অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই, নির্দিষ্ট ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ক্ষমতার পালাবদলেও থামছে না ‘বড়ভাই’ সংস্কৃতি
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় প্রভাব ও আধিপত্যের সমীকরণ বদলালেও কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও পুরোনো প্রভাবশালীরা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন, কোথাও নতুন পরিচয় ও পৃষ্ঠপোষকতায় সক্রিয় হয়েছে অপরাধী গোষ্ঠী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা কিংবা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি ও স্থাপনা দখল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাপ সৃষ্টি, চাঁদাবাজি কিংবা রাজনৈতিক বিরোধে শক্তি প্রদর্শনের জন্যও তাদের কাজে লাগানোর অভিযোগ পাওয়া যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অপরাধের দৃশ্যমান অংশে থাকলেও নেপথ্যে থাকা নির্দেশদাতা, অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকেরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পান। ফলে সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও অপরাধে ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক অক্ষত থেকে যেতে পারে। পরে নতুন সদস্য সংগ্রহ করে একই গোষ্ঠী আবার সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
অপরাধ দমনে তাই শুধু মাঠপর্যায়ে অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। গ্যাংয়ের সদস্যদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখছেন, কে তাঁদের অর্থ বা অস্ত্রের জোগান দিচ্ছেন, অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কোন স্বার্থে তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
এক বছরে ঢাকায় গ্যাং বেড়েছে ৪১টি
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, সারা দেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তালিকাভুক্ত এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বলে পুলিশ সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত এসব গোষ্ঠীতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক তরুণও রয়েছেন।
পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় ১৫৯টি, চট্টগ্রামে ৯৮টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের গোষ্ঠীর তৎপরতার তথ্য রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরের আটটি বিভাগে সক্রিয় ১৫৯টি গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা তিন হাজারের বেশি। গত বছর রাজধানীতে সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ১১৮টি। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে তালিকাভুক্ত গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়েছে ৪১টি।
এই পরিসংখ্যান রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে গ্যাংয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের সদস্যসংখ্যা, অপরাধের ধরন, সাংগঠনিক কাঠামো ও পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করাও জরুরি।
কারণ, একটি গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা বা নামের পরিবর্তন ঘটলেও অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম অব্যাহত থাকতে পারে। আবার তালিকাভুক্ত কোনো গোষ্ঠী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও নতুন নামে আরেকটি দল গড়ে উঠতে পারে। ফলে শুধু তালিকা তৈরি নয়, নিয়মিত তথ্য যাচাই ও অপরাধের প্রবণতা বিশ্লেষণও প্রয়োজন।
অস্ত্রের মহড়া থেকে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও হত্যার অভিযোগ
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো অপরাধের ধরন ও সহিংসতার মাত্রা। আগে অনেক ক্ষেত্রে পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা নিজেদের মধ্যে বিরোধের ঘটনায় এসব গোষ্ঠীর নাম আলোচনায় আসত। এখন ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, দখলবাজি, হামলা ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্যদের ধারালো অস্ত্র হাতে দলবদ্ধভাবে চলাচল বা মহড়া দেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে। এসব ভিডিওতে চাপাতি, ছুরি, চাকু ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র প্রদর্শনের দৃশ্য দেখা যায় বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে।
অস্ত্র প্রদর্শন ও দলবদ্ধ মহড়া কখনো কখনো প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো কিংবা এলাকায় নিজেদের প্রভাব জানান দেওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে কোনো ভিডিওর সত্যতা, সময়, স্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই না করে তা থেকে অপরাধের দায় নির্ধারণ করা যায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভিডিওগুলোকে কেন্দ্র করে যাচাইহীন তথ্য বা পরিচয় ছড়িয়ে দিয়ে নিরপরাধ কাউকে হয়রানির ঝুঁকিও এড়াতে হবে।
কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড ঘিরে আলোচনা
গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও অপরাধে পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসার পর কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধীদের আশ্রয়দাতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, ছিনতাই, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিশোর ও তরুণদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফল, মামলার নথি ও আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর অপরাধকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি হিসেবে দেখলে এর পেছনের সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কারণগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। কোনো কিশোর কীভাবে অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, কারা তাকে ব্যবহার করছে এবং অপরাধের মাধ্যমে সে কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছে—এসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা দরকার।
অপরাধবিজ্ঞানীর মতে, কিশোরদের ব্যবহার করছে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সমাজে ‘মাসল পাওয়ার’ বা পেশিশক্তি ব্যবহারের একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি কিংবা অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য লোকবল প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় কিশোরদের দিয়ে সেই শক্তি গড়ে তোলা হয়। তাঁর ভাষায়, এখান থেকেই ‘ক্রিমিনাল পলিটিশিয়ান নেক্সাস’ তৈরি হয়।
অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কেউ জন্মগতভাবে অপরাধী হয়ে ওঠে না। বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও সাংগঠনিক নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি অপরাধের পথে এগিয়ে যায়।
অধ্যাপক রেজাউল করিমের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে কিশোরদের দিয়ে মাদক পৌঁছে দেওয়া, বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ, এলাকায় মহড়া দেওয়া, চাঁদা তোলা কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কাজ করানো হতে পারে। পরে বড় অপরাধীদের তত্ত্বাবধানে তারা আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আজ যারা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, তাদের একটি অংশ ভবিষ্যতে বড় গ্যাংয়ের নেতা বা সংঘবদ্ধ অপরাধী হয়ে উঠতে পারে। কোনো কিশোর যখন দেখে অপরাধের মাধ্যমে অর্থ, পরিচিতি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সান্নিধ্য, অস্ত্র কিংবা মোটরসাইকেলের মতো সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তখন অপরাধ তার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
অপরাধবিজ্ঞানীর এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়; কিশোরদের অপরাধে টেনে নেওয়ার পেছনে থাকা প্রলোভন, সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়াও জরুরি।
পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ পুলিশের
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে সদস্যদের পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান বলেন, সারা দেশে কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এ বক্তব্য অনুযায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ দমনে শুধু সদস্যদের শনাক্ত করাই নয়, তাদের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও পুলিশের কার্যক্রমে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য কতজন পৃষ্ঠপোষক শনাক্ত হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কতটি তদন্ত বা মামলা হয়েছে এবং সেসব মামলার অগ্রগতি কী—এমন তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে অপরাধ দমনের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হবে।
অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান ডিএমপির
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতন করতে উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে।
অভিভাবকদের দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সন্তান সন্ধ্যার পর বাসা থেকে কোথায় যাচ্ছে এবং কী করছে, সে বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। অভিভাবকেরা সচেতন হলে কিশোর অপরাধ ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিশু-কিশোরদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক আইনি বিধানের বিষয়টিও তুলে ধরেন ডিএমপির এই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিচার ও দণ্ডপ্রক্রিয়ায় বিশেষ বিধান রয়েছে। তাই কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার থেকে সুশিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও সঠিক দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ, জনপ্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
সদস্য গ্রেপ্তারেই কি ভাঙবে অপরাধের নেটওয়ার্ক?
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তার গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আরও বিস্তৃত কৌশল প্রয়োজন। অপরাধের সঙ্গে জড়িত সদস্যদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্রের উৎস, মাদক সরবরাহের পথ, চাঁদাবাজির অর্থের গন্তব্য এবং অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা আর্থিক প্রভাব যেন তদন্তে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আবার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে পৃষ্ঠপোষক বা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমানভাবে অনুচিত।
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অপরাধের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও পরিবারে ফেরানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, অপরাধে ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ করাও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ।
অপরাধ দমনে প্রয়োজন জবাবদিহি ও সমন্বিত উদ্যোগ
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধের অর্থনীতি, সামাজিক অবক্ষয় এবং কিশোরদের সুরক্ষা ও বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল সমস্যা।
অপরাধের দৃশ্যমান সদস্যদের গ্রেপ্তার করার পরও যদি নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থের জোগান এবং অপরাধের সুযোগ অক্ষত থাকে, তাহলে নতুন সদস্য নিয়ে একই গোষ্ঠী আবার সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই অপরাধী নেটওয়ার্কের সব স্তর শনাক্ত করা, তদন্তের ফল প্রকাশ করা এবং আইন অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
পুলিশের দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি কতটা হচ্ছে এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বা স্থানীয় প্রভাবের আড়ালে অপরাধের সুযোগ বন্ধ করা, কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে ‘বড়ভাই’ সংস্কৃতির প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় সদস্য গ্রেপ্তারের পরও গ্যাংয়ের নাম ও নেতৃত্ব বদলে অপরাধের চক্র চলতে থাকার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

