‘২৪ ঘণ্টার জন্য পৃথিবী থেকে সব পুরুষ উধাও হয়ে গেলে আপনি কী করবেন?’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রশ্নের জবাবে এক তরুণী বলেছিলেন, ‘রাতে একা হাঁটতাম। রাত তিনটা বাজে হেঁটে দেখব কেমন লাগে?’
গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই সাক্ষাৎকারে তরুণীর উত্তরটি নারীর নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে চলাচল এবং নির্ভয়ে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছিল। কিন্তু বাস্তবে নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা হয়রানির ঘটনা ঘটলে অনেক সময় অপরাধের নিন্দা করার পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের পোশাক, চলাফেরা, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অশালীন ও অবমাননাকর মন্তব্যের প্রবণতা দেখা যায়।
সম্প্রতি কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগের বিচার এবং নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে কেউ কেউ ভুক্তভোগীকে নিয়েই বিদ্রূপ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ধরনের অনলাইন হয়রানি ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ। গ্রুপটির দাবি, নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য করা শতাধিক ব্যক্তির ছবি, পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করেছে তারা। কয়েকটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দূতাবাসে মন্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠানোর কথাও জানিয়েছে গ্রুপটি।
তবে অনলাইনে হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে কারও পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং আইনগত সীমারেখা মানার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভুল পরিচয় প্রকাশ হলে নির্দোষ ব্যক্তিও সামাজিক ও পেশাগত হয়রানির শিকার হতে পারেন।
অনলাইনে নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের বিরুদ্ধে উদ্যোগ
‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপটির যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আবির আহম্মেদ পিয়াস। তাঁর সঙ্গে মডারেটর হিসেবে কাজ করছেন উম্মে সুরাইয়া সুমি ও জাকিয়া হোসেন। গ্রুপটির সদস্যসংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রুপটিতে বিভিন্ন সংবাদ, সামাজিক ঘটনা ও আলোচিত ব্যক্তিদের পোস্টের নিচে নারীদের উদ্দেশে করা অশালীন মন্তব্য তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মন্তব্যকারীদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করা হয়। গ্রুপটির দাবি, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে অনলাইনে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াসের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপমান করা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানোর পর দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমানোই তাঁদের উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, অনলাইনে করা মন্তব্যও ব্যক্তির সামাজিক আচরণের অংশ। তাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।
গ্রুপটির কার্যক্রমে বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের মন্তব্য সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে প্রবাসী, চিকিৎসক, চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থী রয়েছেন বলে গ্রুপটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের সত্যতা, মন্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা জরুরি।
হবিগঞ্জের কনসার্টের ঘটনা থেকে শুরু
গ্রুপটি গড়ে তোলার পেছনে হবিগঞ্জের একটি কনসার্টে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা ভূমিকা রেখেছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াস।
বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে হবিগঞ্জের জালাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত ওই কনসার্টে বিশৃঙ্খলা ও নারীদের হেনস্তার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আইডি থেকে এক নারীকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার ঘটনা নিয়ে কদর্য ভাষায় মন্তব্য করা হয়। ওই মন্তব্যে অন্য ব্যবহারকারীদের হাস্যরসাত্মক প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়।
ঘটনাটি দেখে ক্ষুব্ধ হন আবির আহম্মেদ পিয়াস ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁদের মনে হয়, নারীদের হেনস্তা করার পাশাপাশি অনলাইনে সেই ঘটনা নিয়ে গর্ব করা কিংবা হাসাহাসির প্রবণতার বিরুদ্ধেও সামাজিক প্রতিক্রিয়া থাকা প্রয়োজন।
এরপরই ‘নো মোর সাইলেন্স’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গ্রুপটির কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁরা বোঝাতে চান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা মন্তব্যেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং অনলাইনে কাউকে অপমান করার বিষয়টি নিছক ব্যক্তিগত রসিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অপরাধের খবরেও ভুক্তভোগীকে দোষারোপ
নারীর প্রতি সহিংসতা বা অপরাধের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার প্রবণতা নতুন নয়। পোশাক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, চলাফেরা কিংবা সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে অনেক সময় এমন মন্তব্য করা হয়, যা ভুক্তভোগীর প্রতি অসম্মান ও বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের একটি হোটেলের শৌচাগারে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের সংবাদ প্রকাশের পর ওই সংবাদকে কেন্দ্র করে অশালীন মন্তব্য করা কয়েকজনের পরিচয় তারা প্রকাশ করে। একইভাবে সাভারে বাসের ভেতরে এক যাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত খবরের নিচে ধর্ষণের পক্ষে মন্তব্য করা ব্যক্তিদের মন্তব্যও তুলে ধরে গ্রুপটি।
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে এক ব্যক্তির বাদানুবাদের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ওই নারীকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ ও অশ্লীল মন্তব্যের অভিযোগ ওঠে। গ্রুপটি এসব মন্তব্যের কয়েকটি প্রকাশ করে মন্তব্যকারীদের পরিচয় সামনে আনে বলে জানিয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা দেখায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো নারী প্রতিবাদ করলে বা নিজের অবস্থান তুলে ধরলে তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে মূল ঘটনা থেকে আলোচনার কেন্দ্র সরে গিয়ে প্রতিবাদকারী নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কটাক্ষ শুরু হয়।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর শারমিন রিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো বিষয়ে মতভিন্নতা থাকলেও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর মতে, প্রতিবাদকারীর ব্যক্তিগত জীবনকে আক্রমণ না করে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হচ্ছে, সেটির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
পরিচয় প্রকাশের পর কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ
গ্রুপটির দাবি, কয়েকটি ঘটনায় অশালীন মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশে অবস্থান করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে মন্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা বা অভ্যন্তরীণ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছে গ্রুপটি।
একটি ঘটনায় মেয়ের কলেজজীবন শুরুর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন এক বাবা। সেখানে অভিনন্দনমূলক মন্তব্যের পাশাপাশি একজন ব্যক্তি অশালীন মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। গ্রুপটিতে বিষয়টি তুলে ধরার পর সংশ্লিষ্ট ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় বলে গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
আরেক ঘটনায় এক ব্যক্তির অশালীন মন্তব্যের স্ক্রিনশট বিদেশে অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁ, সংশ্লিষ্ট দূতাবাস এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করেছে গ্রুপটি। ওই ব্যক্তি প্রথম আলোকে জানান, তাঁর কর্মস্থল থেকে তাঁকে এ ধরনের মন্তব্যের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে এবং তিনি মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়া নারীর প্রতি যৌন সহিংসতামূলক মন্তব্যের অভিযোগে এক মেডিকেল শিক্ষার্থীর মন্তব্যের স্ক্রিনশট তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয় বলে গ্রুপটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ওই শিক্ষার্থী পরে শব্দচয়ন ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার কথা জানান।
তবে এসব ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের সতর্কবার্তা, তদন্ত কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা নির্ভরযোগ্য নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট বা গ্রুপের বক্তব্যকে এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
প্রতিবাদের পাশাপাশি ভুল পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকি
অনলাইনে নারীদের হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজন থাকলেও কারও পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট, হ্যাক হওয়া আইডি কিংবা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে মন্তব্য করার ঘটনা ঘটতে পারে।
‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপের কার্যক্রমেও এ ধরনের ঝুঁকির একটি উদাহরণ সামনে এসেছে। গ্রুপটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার কিশোরী হত্যার বিচার চেয়ে তার মায়ের বক্তব্যসংক্রান্ত একটি সংবাদে অশালীন মন্তব্য করা এক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়। ওই ব্যক্তি নিজেকে রাজধানীর সানরাইজ প্লাজার বিশ্বরঙ শোরুমের বিক্রয়কর্মী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে বিশ্বরঙ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই।
এ ঘটনা পরিচয় যাচাইয়ের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। কোনো মন্তব্যের স্ক্রিনশটে নাম বা ছবি থাকলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই মন্তব্যটি করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন, আবার ভুয়া আইডি ব্যবহার করেও কাউকে ফাঁসানোর চেষ্টা হতে পারে।
তাই অনলাইনে হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে প্রমাণ সংরক্ষণ, অ্যাকাউন্টের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে নতুন করে হয়রানি তৈরি না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় আইনি প্রতিকার
বাংলাদেশে অনলাইনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি, হুমকি, ব্ল্যাকমেলিং কিংবা ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও অপব্যবহারের ঘটনায় পরিস্থিতি ও অপরাধের ধরন অনুযায়ী আইনি প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, ঘটনার সময় এবং অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ধারার প্রয়োগ নির্ধারিত হয়।
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কোনো নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি কিংবা কোনো কিছু প্রদর্শনের মাধ্যমে অপমান করার বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। অনলাইনে করা কোনো মন্তব্য এই ধারার আওতায় পড়বে কি না, তা নির্ভর করবে ঘটনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও আইনের প্রয়োগের ওপর।
এ ছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং, ব্যক্তিগত বা যৌন প্রকৃতির উপাদান ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং এ ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রকাশের অভিযোগে প্রযোজ্য সাইবার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সব ধরনের অশালীন মন্তব্য একই আইনি ধারায় পড়ে না; অভিযোগের প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ভুক্তভোগীরা অনলাইনে করা মন্তব্যের স্ক্রিনশট, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের লিংক, পোস্টের সময় ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেন। প্রয়োজনে আইনজীবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নারী ও শিশুদের আইনি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
সচেতনতা ও জবাবদিহি—দুটিই জরুরি
বাংলাদেশে নারীর প্রতি অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় শুধু অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবর্তে অপরাধের বিচার ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্ল্যাটফর্মের ফোকাল পারসন মনীষা বিশ্বাসের বক্তব্য অনুযায়ী, অশালীন মন্তব্য ও ছবি বিকৃত করে হয়রানির ঘটনায় অনেক নারী আইনি প্রতিকার নিতে আগ্রহী হন না। এতে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা আরও উৎসাহিত হতে পারেন। তাঁর মতে, অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইনি প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীদের আলোচনায় অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে শালীনতা, ভুক্তভোগীর প্রতি সহমর্মিতা, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, আইনগত জবাবদিহি এবং পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা।
‘নো মোর সাইলেন্স’-এর মতো উদ্যোগ অনলাইনে নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই উদ্যোগ কার্যকর ও ন্যায়সংগত রাখতে তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান এবং আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু নারীর একার নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। অনলাইনে কাউকে অপমান করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে যেমন সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত প্রতিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

