জাতীয় রাজনীতিতে সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা এবং দলীয় কার্যক্রমে গতি আনতে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতাদের নিয়ে গড়ে ওঠা দলটির নতুন সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন চার তরুণ নেতা—নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
দলটির দায়িত্বশীল ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হতে পারে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনে দলের শীর্ষ দুই পদে কোনো পরিবর্তন আসছে না। আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে আখতার হোসেনই দায়িত্বে থাকছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদগুলোতে রদবদল এবং নতুন দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে নেতৃত্বের কাঠামো আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, নেতাদের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তা এবং বিগত দিনের পারফরম্যান্স বিবেচনায় নিয়ে নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত পদবিন্যাস ও কমিটির চূড়ান্ত তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব পরিবর্তনকে সম্ভাব্য হিসেবেই দেখতে হবে।
শীর্ষ দুই পদে থাকছেন নাহিদ ও আখতার
এনসিপির পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আহ্বায়ক পদে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব পদে আখতার হোসেনের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক এবং আখতার হোসেনকে সদস্যসচিব করে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ এবং বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই দুই নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
দলটির নেতৃত্বের শীর্ষ দুই পদ অপরিবর্তিত রেখে অন্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগকে সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন নেতৃত্বকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হচ্ছেন হাসনাত ও নাসীরুদ্দীন
প্রস্তাবিত পুনর্গঠিত কমিটিতে হাসনাত আবদুল্লাহ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক পদে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানা গেছে।
বর্তমানে হাসনাত আবদুল্লাহ এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন পদে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে দলের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাঁদের ভূমিকা আরও বাড়তে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তরুণ নেতৃত্বের সক্রিয়তা এনসিপির পরিচিতির অন্যতম দিক। দলটির সাংগঠনিক কাঠামোয় এই নেতাদের অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা সেই নেতৃত্বকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও সম্পৃক্ত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে নতুন পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁদের নির্দিষ্ট সাংগঠনিক দায়িত্ব, কর্মপরিধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কী হবে, তা চূড়ান্ত কমিটি প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।
সারজিস ও আসিফ মাহমুদ পাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমকে সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব পদে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই পদে আসতে পারেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও।
সারজিস আলমের নেতৃত্বে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নতুন দায়িত্বের মাধ্যমে দলীয় বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এনসিপির মতো নতুন রাজনৈতিক দলের জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং মাঠপর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের ওপর দলটির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সারজিসের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের সাংগঠনিক উপকমিটি
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সারজিস আলমের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি সাংগঠনিক উপকমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় একজন উপপ্রধান দক্ষিণাঞ্চল এবং আরেকজন উত্তরাঞ্চলের দায়িত্ব পালন করবেন। সূত্রে তাঁদের আদিব ও জুনায়েদ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির বাকি সদস্যদের মধ্যে ১০ জন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং আরও ১০ জন বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন।
এই উপকমিটি গঠিত হলে বিভাগীয় পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রমের সমন্বয়, সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা, নতুন কর্মী সংগঠিত করা এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের কাজ আরও কাঠামোবদ্ধভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়; জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের কার্যক্রম সক্রিয় রাখা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত উপকমিটির মাধ্যমে সে ধরনের সাংগঠনিক সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্য থাকতে পারে।
আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক শক্তি
এনসিপির সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি নতুন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এনসিপির অঙ্গসংগঠন হিসেবে ‘জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক শক্তি’র আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে। পাশাপাশি ‘জাতীয় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান এলায়েন্স’ নামে একটি সহযোগী সংগঠন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া পুনর্গঠন করা হচ্ছে এনসিপির নারী শক্তি।
নতুন সংগঠনগুলো গঠন ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তি এবং নারী নেতৃত্বের সঙ্গে দলের সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব সংগঠনের চূড়ান্ত নাম, নেতৃত্ব, দায়িত্ব বণ্টন ও কার্যক্রমের পরিধি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিস্তারিত কাঠামো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সংসদীয় রাজনীতিতে অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশের পর এনসিপি জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দলটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে দলটির আটজন সংসদ সদস্য রয়েছেন।
সংসদীয় রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি দলীয় সংগঠন বিস্তৃত করা, রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ, জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব গড়ে তোলা এনসিপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগকে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতৃত্বের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার লক্ষ্য থাকতে পারে।
তবে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে ঘোষিত পদবিন্যাসের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কাজের পরিধি, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।
চূড়ান্ত কমিটি ঘোষণার অপেক্ষা
এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে দলটির ভেতরে আলোচনা এগিয়ে চলছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় শীর্ষ দুই পদ অপরিবর্তিত রেখে চার তরুণ নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সাংগঠনিক উপকমিটি গঠন এবং নতুন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন চালুর উদ্যোগও আলোচনায় রয়েছে।
দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকা প্রকাশের কথা বলা হলেও চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত পদবিন্যাসে পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে, এনসিপির এই পুনর্গঠন উদ্যোগ দলের নেতৃত্বের কাঠামো, সাংগঠনিক বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলে কী ধরনের পরিবর্তন আনে, তা নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত কমিটি ঘোষণা ও পরবর্তী কার্যক্রমের মাধ্যমে।

