জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, জুলাই গণহত্যার বিচার কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব কার্যক্রমের ব্যবধান রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তাঁরা। একই সঙ্গে বিচার ত্বরান্বিত করা, তদন্তে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং শহীদ পরিবারের কাছে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়মিত তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব বক্তব্য উঠে আসে। ‘জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণ বিষয়ক কমিটি’ আয়োজিত ‘জুলাই গণহত্যার বিচার: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান’ শীর্ষক সভায় এনসিপির নেতাদের পাশাপাশি আইনজীবী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেন।
সভায় বক্তারা বিচারপ্রক্রিয়ার গতি, তদন্তের মান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের প্রত্যাশা পূরণে বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে সভায় বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যে সরকার ও বিএনপির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলো তাঁদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও দাবি। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্ত পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
‘বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ’
আলোচনা সভায় বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘বিএনপির মুখে জুলাই, কিন্তু অন্তরে আওয়ামী লীগ’—এমন একটি সম্পর্ক দেশের রাজনীতিতে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নির্যাতন, মামলা ও কারাবরণের শিকার বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ৫ আগস্টের পর দলটিতে যুক্ত হওয়া নতুন অংশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতনের শিকার বিএনপির অনেক নেতাকর্মী বর্তমানে দলের ভেতরে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, নতুন করে বিএনপিতে যুক্ত হওয়া একটি অংশ ব্যবসায়িক সুবিধা ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে তিনি বক্তব্যে বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরেননি। বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যও সভায় উপস্থাপিত হয়নি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দলীয় বক্তব্যের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ঘটনা, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের পর্যবেক্ষকেরা।
‘জুলাই গণহত্যার বিচার দায়সারা বিষয়ে পরিণত হয়েছে’
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন অভিযোগ করেন, জুলাই গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া সরকারের কাছে দায়সারা বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, দুবাইয়ে বেনজীরকে আটক করা হয়েছে বলে সরকার সংসদে কৃতিত্ব নিয়েছিল। পরে তিনি ছাড়া পাওয়ার পর সরকার আর কোনো বক্তব্য দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিচারপ্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রসঙ্গ টেনে আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, বিএনপি সরকার কীভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের বিচার করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, দলটির একাংশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে এবং সরকার এসব সমস্যা সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার বলছে, দলে চাঁদাবাজদের স্থান নেই। কিন্তু তাঁর দাবি, দলের মধ্যে ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি রয়েছে। বক্তব্যে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে অতিরঞ্জিত সংখ্যাভিত্তিক অভিযোগও করেন, যদিও এর পক্ষে কোনো পরিসংখ্যান বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর নির্যাতনের শিকার হওয়ার অর্থ এই নয় যে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা ভাঙচুর করবে। এ প্রসঙ্গে তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিশোধের পরিবর্তে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মাত্র ১৩টি মামলার বিচার চলছে। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসলেও তা করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শাহীন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দল হিসেবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে এনসিপির পক্ষ থেকে দাবি জানানো হচ্ছে, যেন জুলাই গণহত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
তাঁর বক্তব্যে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
তবে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা, তদন্তাধীন অভিযোগ এবং নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্তকারী পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ
জুলাই গণহত্যার মামলার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূর।
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাকে জুলাই গণহত্যার মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এসব কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
একটি মামলার রায়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে এমন একটি মামলার রায় হয়েছে, যেখানে সাজাপ্রাপ্ত সাতজনই পলাতক ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
হুমায়রা নূর তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে শহীদদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে তদন্তের নিরপেক্ষতা, অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব জরুরি।
তবে কোন মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এবং কোন মামলার রায়ে সাতজন দণ্ডিত ব্যক্তি পলাতক ছিলেন, তা বক্তব্যে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এসব অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন আইনজীবীদের
ন্যাশনাল লইয়ার্স অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট এরশাদুল বারী খন্দকার বলেন, যে বিরোধী দল ১৭ বছরে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, সেই দলকে বিশ্বাস করা তাঁদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।
তিনি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, তাঁর কথা শুনলে মনে হয় না সরকার জুলাই গণহত্যার বিচার করতে চায়।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা রয়েছে, তা নিয়ে তাঁর বক্তব্যে সংশয় প্রকাশ পায়। তাঁর মতে, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না; বিচার এগিয়ে নিতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
আলোচনা সভায় আইনজীবীদের বক্তব্যে তদন্ত, বিচার এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
শহীদ পরিবারের দাবি: রায় কার্যকরের সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি জানাতে হবে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী তাঁর বক্তব্যে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে পরিবারের প্রত্যাশা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল্লাহ আল মামুনের শাস্তি নিয়ে যে রায় হয়েছে, সেখানে আব্দুল্লাহ আল মামুনের শাস্তি কোনোভাবেই যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, তাঁরা ফাঁসির রায় কার্যকরের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দেখতে চান। একই সঙ্গে সরকারকে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও নিয়মিত তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী আরও বলেন, কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধী নন—এমন ব্যক্তিদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে তাঁদের মনে হয়েছে। তাঁর দাবি, তাঁর ভাই হত্যার সঙ্গে যারা প্রকৃতপক্ষে জড়িত, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ভাই হত্যার পর সাংবাদিকেরা তাঁদের মামলা করবেন কি না জানতে চেয়েছিলেন। তখন তাঁরা মামলা করেননি। ৫ আগস্টের পর বিচার চাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে মনে করে তাঁরা মামলা করেছেন বলে জানান তিনি।
শহীদ পরিবারের এই বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে—প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ কাউকে যেন অন্যায়ভাবে মামলায় জড়ানো না হয়, তা নিশ্চিত করা।
তবে সংশ্লিষ্ট মামলার রায়, দণ্ডের ধরন, আপিলের অবস্থা এবং সাজা কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট আদালত ও কর্তৃপক্ষের নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
আহত জুলাই যোদ্ধার প্রশ্ন: বিচার নিয়ে এত দাবি কেন?
জুলাই ওয়ারিয়র্স অ্যালায়েন্সের সভাপতি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধা মো. সালমান হোসেন বলেন, ১৯ জুলাই জুমার দিন তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁকে যে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে রাত কাটাতে হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও যদি একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো, তাহলে তিনি বুঝতে পারতেন কেন আহত ব্যক্তিরা বারবার বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।
সালমান হোসেনের বক্তব্যে আহত ব্যক্তিদের শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার বিষয়টি উঠে আসে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের মতে, বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। তাই তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁদের নিয়মিত অবহিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জবাবদিহি চাইলেন আহত জুলাই যোদ্ধা
আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জুলাই ওয়ারিয়র্স অ্যালায়েন্সের সহসভাপতি ও আহত জুলাই যোদ্ধা মায়মুনা মায়া।
তিনি বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে প্রশ্ন করতে চান, তারা জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে কতটা আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছে।
তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। তিনি মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচারের দাবিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
সভায় বক্তারা আরও বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান মূল্যায়ন করতে হলে তাদের প্রকাশ্য বক্তব্যের পাশাপাশি তদন্তে সহযোগিতা, বিচারিক কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন এবং অপরাধের দায় নির্ধারণে বাস্তব পদক্ষেপও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার দাবি
আলোচনা সভায় উত্থাপিত বক্তব্যগুলোতে কয়েকটি দাবি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো হলো—
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বিচারপ্রক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করা।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের বিচার ও মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দেওয়া।
প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব কার্যক্রমের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা।
বক্তাদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচারের দাবি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয় নয়; এটি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে প্রয়োজন দৃশ্যমান অগ্রগতি
জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার নিয়ে এনসিপির আলোচনা সভায় সরকারের ভূমিকা, বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান, তদন্তকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নিয়ে একাধিক অভিযোগ ও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
বক্তারা দ্রুত বিচার, স্বচ্ছ তদন্ত এবং শহীদ পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের দাবি জানিয়েছেন। তবে তাঁদের বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, তদন্তকারী সংস্থা, ট্রাইব্যুনাল এবং যেসব রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
মামলার সংখ্যা, তদন্তের অগ্রগতি, অভিযোগপত্র দাখিল, বিচারাধীন মামলার অবস্থা এবং আদালতের রায়সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়ে এনসিপির এই আলোচনা সভায় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কার্যক্রমের ব্যবধান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। বক্তাদের মূল দাবি—বিচারপ্রক্রিয়া যেন দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে আটকে না থাকে; বরং নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার এবং দৃশ্যমান অগ্রগতির মাধ্যমে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের প্রত্যাশা পূরণ করা হয়।

