নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইভীর সমালোচনা করেছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাবেশে আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, ‘সাবেক মেয়র, আপনাকে শান্তিতে বাড়িতে ঘুমাতে দিয়েছি। আপনি শান্তিতে ঘুমান। যদি আপনি কোনও নয়-ছয় করেন ও নিষিদ্ধ স্লোগান “জয় বাংলা” দিয়ে নারায়ণগঞ্জকে উত্তপ্ত করতে চান, তাহলে কিন্তু আপনার হোয়াইট হাউসের (আইভীর বাড়ি) ইট থাকবে না।’
তাঁর এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বক্তব্যের একাংশে আইভীর বাড়ি নিয়ে হুমকিসূচক মন্তব্য থাকায় রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যের ভাষা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
আইভীকে ঘিরে বিএনপি নেতার কঠোর বক্তব্য
সমাবেশে টিপু ভারতে চিকিৎসাধীন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের প্রসঙ্গ টেনে আইভীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘একজন ভারতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন, তারপর আপনিও (আইভী) ভালো থাকবেন কি না সেটা সন্দিহান।’
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছে। বিএনপি নেতৃত্ব আইভীর প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আইভী আবার নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে এসে এ ধরনের স্লোগান দিলে তাঁকে ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন বিএনপির এই নেতা। একই সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান।
তবে টিপুর বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত ও দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। এ বিষয়ে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর কোনো বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আদালত প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ঘিরে বিতর্ক
এর আগে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সিদ্ধিরগঞ্জে রিকশাচালক তুহিন হত্যা মামলায় আদালতে হাজির হয়ে জামিন পান সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। জামিন পাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে তাঁকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দেখা যায় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় আইভী বলেন, ‘জয় বাংলাকে দাবিয়ে রাখা যাবে না।’
এই স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়। বিএনপি নেতারা এর প্রতিবাদ জানান। অন্যদিকে, স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।
উল্লেখ্য, কোনো স্লোগান বা রাজনৈতিক বক্তব্যের আইনগত অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, প্রযোজ্য সরকারি আদেশ এবং ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আইভীর আইনজীবীসহ তিনজন গ্রেপ্তার
আইভীর স্লোগান দেওয়ার ঘটনার পরদিন তাঁর আইনজীবীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ও আইনজীবী জিয়াউল ইসলাম কাজল, আইনজীবী মাহবুবুর রহমান তুষার এবং কাজলের ভাই আতিকুল ইসলাম।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের কর্মী হিসেবে ওই তিনজন আগের দিন আদালত প্রাঙ্গণে সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে ছিলেন। সেখানে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তাঁদের বক্তব্য বা আইনজীবীদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
বিক্ষোভ সমাবেশে বিএনপির নেতারা উপস্থিত
বুধবারের বিক্ষোভ সমাবেশে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন, সরকার হুমায়ুন ও জাকির হোসেন, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল কালাম আজাদ জাকির এবং জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে বক্তারা আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানান এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে দায়িত্বশীল আচরণের প্রশ্ন
সাবেক মেয়র আইভীর জামিন, আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়া, তাঁর আইনজীবীসহ তিনজনের গ্রেপ্তার এবং বিএনপি নেতার কঠোর বক্তব্য—সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, আদালতের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে আইন অনুসরণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে কোনো ব্যক্তি বা তাঁর সম্পত্তির নিরাপত্তা যেন হুমকির মুখে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা জরুরি।
নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনাপ্রবাহের পর রাজনৈতিক দলগুলোর পরবর্তী অবস্থান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

