ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

দেশের সব মাদ্রাসার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর জরুরি নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০২:১০ পিএম

দেশের সব মাদ্রাসার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর জরুরি নির্দেশনা

ছবিঃ সংগৃহীত

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক চর্চা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে দেশের সব ইবতেদায়ি, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এসব প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে দেশের সব মাদ্রাসাপ্রধানকে এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিজ নিজ আওতাধীন মাদ্রাসাগুলোতে নির্দেশনার বাস্তবায়ন তদারকি এবং কার্যক্রম অনুসরণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নির্দেশনায় জাতীয় পর্যায়ে নজরুল চর্চা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নতুন প্রজন্মের কাছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম ও আদর্শ তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সব স্তরের মাদ্রাসায় হবে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা

নির্দেশনা অনুযায়ী, ইবতেদায়ি থেকে শুরু করে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের শিক্ষাস্তর উপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। এসব প্রতিযোগিতায় নজরুলের ইসলামি সংগীত ও গজল, কবিতা আবৃত্তি, হামদ-নাত, রচনা এবং বক্তৃতার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বয়স, শ্রেণি ও শিক্ষাস্তর বিবেচনায় প্রতিযোগিতার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাহিত্যপ্রীতি, সাংস্কৃতিক সচেতনতা, ভাষাগত দক্ষতা, যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষমতা এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্মারক ও নির্দেশনার আলোকে এ আয়োজনের উদ্দেশ্য হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ জোরদার করার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

ইবতেদায়ি পর্যায়ে যেসব প্রতিযোগিতা

ইবতেদায়ি পর্যায়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক সহজ ও বয়সোপযোগী প্রতিযোগিতার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা নজরুলের ইসলামি সংগীত বা গজল, নির্ধারিত কবিতা আবৃত্তি, হামদ ও নাত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে। নির্ধারিত কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘তোর হলো খোকাবাবুর স্বাদ’, ‘মা’ ও ‘সংকল্প’।

এ ছাড়া তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আমার চোখে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক রচনা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নির্ধারিত বক্তৃতার বিষয়েও অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের নজরুলের কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত করা এবং তাদের মধ্যে আবৃত্তি, লেখালেখি ও বক্তব্য উপস্থাপনের আগ্রহ তৈরি করাই এসব প্রতিযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য।

দাখিল পর্যায়ে কবিতা, গজল ও রচনা প্রতিযোগিতা

দাখিল পর্যায়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একাধিক বিষয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে বলা হয়েছে।

এ পর্যায়ের প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে নজরুলের ইসলামি সংগীত বা গজল, হামদ ও নাত, নির্ধারিত কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা এবং রচনা প্রতিযোগিতা।

নির্ধারিত কবিতা আবৃত্তির জন্য ‘কিশোর ফুল’, ‘কুলি মজুর’, ‘মানুষ’ ও ‘নারী’ কবিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

রচনা প্রতিযোগিতার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে দুটি বিষয়— ‘নজরুলের দেশপ্রেম’ এবং ‘নজরুল সাহিত্যে ও সংগীতে ইসলামের সাম্যের ধারণা’।

এসব বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নজরুলের দেশপ্রেম, মানবতাবাদ, সাম্য, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সাহিত্য ও সংগীতে ইসলামের মূল্যবোধের প্রতিফলন সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

আলিম পর্যায়ে নজরুলের কবিতা ও সাহিত্য নিয়ে প্রতিযোগিতা

আলিম পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্যও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যবিষয়ক প্রতিযোগিতার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ পর্যায়ে নজরুলের যেকোনো কবিতা আবৃত্তি, ইসলামি সংগীত বা গজল, হামদ ও নাত এবং উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।

পাশাপাশি ‘ভাবুক ও নজরুল’ বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে বলা হয়েছে।

আলিম পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এসব আয়োজন নজরুলের সাহিত্যভাবনা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা এবং নিজস্ব চিন্তা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করবে।

ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে ‘নজরুল ও মানুষের মুক্তি’ বিষয়ে রচনা

ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নজরুলের সাহিত্য, সংগীত ও মানবমুক্তির দর্শনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিযোগিতার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা নজরুলের যেকোনো কবিতা আবৃত্তি, ইসলামি সংগীত বা গজল, হামদ ও নাত এবং উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে।

এ ছাড়া ‘নজরুল ও মানুষের মুক্তি’ শীর্ষক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মে শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নির্ধারিত রচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে নিজেদের চিন্তাভাবনা ও যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ পাবে।

রচনা প্রতিযোগিতায় মৌলিক লেখা বাধ্যতামূলক

নির্দেশনায় রচনা প্রতিযোগিতার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব শর্ত অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের রচনা প্রস্তুত ও জমা দিতে হবে।

প্রথমত, রচনা সম্পূর্ণ মৌলিক হতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিজেদের চিন্তা, উপলব্ধি ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে রচনা লিখতে হবে। রচনা হাতে লিখে জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তথ্যসূত্র উল্লেখ করতে হবে। রচনায় ব্যবহৃত তথ্যের উৎস হিসেবে সংশ্লিষ্ট বই, প্রবন্ধ বা লেখকের পরিচিতি ও রেফারেন্স উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের তথ্যভিত্তিক লেখালেখি, পাঠাভ্যাস ও গবেষণামুখী চিন্তায় উৎসাহিত করা হবে।

তৃতীয়ত, শব্দসংখ্যার সীমা মেনে চলতে হবে। শিক্ষাস্তর অনুযায়ী রচনার সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করে বিষয়বস্তুর যথাযথ উপস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

শব্দসীমা অনুযায়ী—

ইবতেদায়ি পর্যায়: সর্বোচ্চ ৫০০ শব্দ।
দাখিল পর্যায়: সর্বোচ্চ ১,০০০ শব্দ।
আলিম পর্যায়: সর্বোচ্চ ১,৫০০ শব্দ।
ফাজিল ও কামিল পর্যায়: সর্বোচ্চ ২,০০০ শব্দ।

শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত শব্দসীমার মধ্যে প্রাসঙ্গিক তথ্য, যুক্তি ও নিজস্ব বিশ্লেষণ উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তদারকি করবেন জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা

সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক তদারকির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের তাঁদের নিজ নিজ আওতাধীন মাদ্রাসাগুলোতে নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, মাদ্রাসাপ্রধানদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিযোগিতার বিষয় নির্বাচন, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে উৎসাহ দেওয়া এবং নির্দেশনায় উল্লেখিত শর্ত অনুসরণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

তবে প্রতিযোগিতা আয়োজনের নির্দিষ্ট তারিখ, পর্যায়ভিত্তিক সময়সূচি, মূল্যায়নপদ্ধতি, বিজয়ী নির্বাচন এবং পুরস্কারসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে কীভাবে উল্লেখ রয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের মেধা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্ব

শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আলোচনায় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, ভাষাগত দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক মূল্যবোধ বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সংগীতে সাম্য, মানবতা, দেশপ্রেম, প্রতিবাদ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার নানা দিক উঠে এসেছে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে পাঠ, আবৃত্তি, সংগীত পরিবেশন ও রচনা প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে জানার আগ্রহ বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাস্তরভিত্তিক এমন আয়োজন সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে, নজরুল বর্ষ উপলক্ষে দেশের সব ইবতেদায়ি, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের নির্দেশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাদ্রাসাপ্রধানদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!