দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের সরকারের সময়কার ধারা এখনো পরিবর্তন হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তাঁর দাবি, বর্তমানে এমন কিছু ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাদের মান ‘অবিশ্বাস্য মাত্রায় নিম্নমানের’। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এসব নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ‘বাংলাদেশে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা: অবস্থা, প্রকৃতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতাকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও প্রকৃত অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
স্বায়ত্তশাসন থাকলেই অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গ তুলে আনু মুহাম্মদ বলেন, আইনে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার থাকাই যদি অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার প্রধান শর্ত হতো, তাহলে দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার ব্যাপক চর্চা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে আইনগতভাবে স্বায়ত্তশাসিত ঘোষণা করলেই সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকদের স্বাধীন মতপ্রকাশ, গবেষণা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত হয় না। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের সুযোগ প্রয়োজন।
‘প্রায় ১১০০ শিক্ষক কীভাবে স্বাক্ষর করলেন?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১১০০ শিক্ষক কীভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে—এ মর্মে স্বাক্ষর করলেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, ওই শিক্ষকদের সবাইকে কি এমন স্বাক্ষরের জন্য বাধ্য করা হয়েছিল, নাকি তারা স্বেচ্ছায় এতে স্বাক্ষর করেছিলেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোন পরিবেশে এবং কী বিবেচনায় এমন অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটিও অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা ও শিক্ষকদের দায়বদ্ধতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষকদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সহজে চলে যায় না উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ শিক্ষকদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টিও শিক্ষকদের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একজন শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন—নাকি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, শিক্ষকদের মধ্যে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়ে কতটা তাগিদ, আগ্রহ ও অঙ্গীকার রয়েছে—সেটিও আলোচনার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিজেদের ভূমিকা নিয়েও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
‘সমস্যা ছাত্র সংগঠনে নয়, সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনে’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন আনু মুহাম্মদ। তিনি জানান, ষাটের দশক থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির একটি পর্যালোচনা করেছিলেন তিনি। ওই পর্যালোচনায় তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, ছাত্র সংগঠন বা ছাত্র রাজনীতিকে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ছাত্র সংগঠন, ছাত্র রাজনীতি কিংবা সন্ত্রাসের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হলে বলতে হবে—‘সমস্যা ছাত্র সংগঠনে নয়, সমস্যা সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন নিয়ে।’
আনু মুহাম্মদের ভাষ্য, সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের বিষয়টি মূলত সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর কাঠামো রাষ্ট্র ও সরকারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এর প্রভাবও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে ছাত্র রাজনীতির সংকট নিয়ে আলোচনা করতে হলে সরকার ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের সম্পর্ককেও বিবেচনায় নিতে হবে।
অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার সংকট কোথায়?
আলোচনায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা কেবল প্রশাসনিক বা আইনগত স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক পরিবেশ, উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়া, শিক্ষকদের স্বাধীন মতপ্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহি এবং ছাত্র রাজনীতির ধরন—সবকিছুর সঙ্গেই অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভয় বা রাজনৈতিক চাপমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন বলেও তাঁর বক্তব্য থেকে উঠে আসে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় যোগ্যতা, দক্ষতা ও স্বাধীন চিন্তার গুরুত্ব নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
গোলটেবিল আলোচনায় আরও যারা ছিলেন
‘বাংলাদেশে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা: অবস্থা, প্রকৃতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামস্ রহমান, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শেখ নাহিদ নিয়াজী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শর্মী হোসেন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আল মামুন।
গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার বর্তমান অবস্থা, এর সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মতপ্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, উপাচার্য নিয়োগ এবং ছাত্র রাজনীতিসহ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর পাশাপাশি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রভাবের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তাঁর মতে, দেশের সামগ্রিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ শক্তিশালী না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আলাদাভাবে পূর্ণাঙ্গ অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

