জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং গণভোটের রায় কার্যকর করা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা ও মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হচ্ছে না বলে মনে করেন সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ। তাঁর মতে, জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হলে জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখ করা অঙ্গীকারগুলোকে সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ২৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ কেবল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগ বা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতার দলিল নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে রয়েছে, তার প্রতিফলন। তবে সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে একধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তা, গণভোটের বৈধতা ও রাজনৈতিক তাৎপর্য, সনদে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত সংরক্ষণ, পুনরায় গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব এবং রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
কেন প্রয়োজন হয়েছিল জুলাই জাতীয় সনদ?
আলী রীয়াজের মতে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোর সমাধানের লক্ষ্যেই জুলাই জাতীয় সনদের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা হলো এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকবে না। জুলাই জাতীয় সনদে এসব আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।
তাঁর ভাষ্য, সনদ প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবগুলো একটি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন সাংবিধানিক সংশোধন নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা।
আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নাগরিকদের একটি অঙ্গীকারের দলিল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে কীভাবে গড়ে তোলা হবে, সে বিষয়ে একটি সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়েছিল।
তবে সনদ স্বাক্ষরের পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়াকে তিনি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবায়নের গতি শ্লথ এবং ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে একধরনের অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও তিনি মনে করেন, এই ধীরগতি রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে শেষ করে দেয় না।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ধারণা কেন সামনে এসেছিল, তার ব্যাখ্যায় আলী রীয়াজ বলেন, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর ব্যাপ্তি ও প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে একটি বিশেষ কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল।
তাঁর মতে, প্রচলিত সংবিধানের অধীনে সাধারণ সংশোধনপ্রক্রিয়া ব্যবহার করে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনা নিয়ে আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তন আনতে গেলে সংশোধনের পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিষয়টি এসেছিল যে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের ধারণা সামনে আসে।
আলী রীয়াজের আশঙ্কা, এখন যদি বিভিন্ন প্রস্তাব থেকে বেছে বেছে কিছু সংশোধন করা হয়, তাহলে সামগ্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য পূরণ হবে না। এতে কিছু পরিবর্তন হলেও জুলাই জাতীয় সনদের মাধ্যমে নাগরিকেরা যে বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলেন, তা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, ক্ষমতার কাঠামো, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ক্ষমতা, এর গঠন এবং সংশোধনের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংবিধান, প্রযোজ্য আইন ও আদালতের এখতিয়ারের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। আলী রীয়াজের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচলিত সংসদের মাধ্যমে মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে গেলে ভবিষ্যতে আদালতে সেই পরিবর্তনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
গণভোটের রায় উপেক্ষা করা যাবে না
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিতর্কে গণভোটের ফলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন আলী রীয়াজ। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হওয়ার পরও সাধারণ নাগরিকদের সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সে কারণেই সনদ বাস্তবায়নের প্রস্তাব গণভোটে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ২৬টি দল সনদে স্বাক্ষর করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতাই চূড়ান্ত বিষয় নয়; নাগরিকদের সম্মতির মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে বৃহত্তর বৈধতা নিশ্চিত করাই ছিল গণভোটের উদ্দেশ্য।
আলী রীয়াজের ভাষ্য, জনগণের সম্মতি রাষ্ট্র সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জনগণ যে প্রস্তাবগুলোর পক্ষে মত দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে।
তাঁর মতে, সংসদ নির্বাচনে জনগণ কোনো দলকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে পারে এবং একই সঙ্গে গণভোটে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবের পক্ষেও মত দিতে পারে। দুটি সিদ্ধান্ত একই ভোটারদের কাছ থেকে আসতে পারে। তাই একটি সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করে অন্যটিকে উপেক্ষা করা রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
তিনি বলেন, জনগণ যদি কোনো দলকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট পরিবর্তনও চেয়ে থাকে, তাহলে সেই দলকে উভয় সিদ্ধান্তের প্রতিই দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
তবে গণভোটের ফলের সাংবিধানিক প্রভাব, বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রশ্ন, প্রযোজ্য আইন ও সরকারি নথির বিষয়বস্তু গুরুত্বপূর্ণ। আলী রীয়াজের বক্তব্য মূলত জনগণের রায়ের প্রতি রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেয়।
নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ মানেন না আলী রীয়াজ
জুলাই জাতীয় সনদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত সংরক্ষণ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন আলী রীয়াজ।
তিনি বলেন, সনদ প্রণয়নের সময় সব রাজনৈতিক দল সব বিষয়ে একমত হয়নি। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য দলেরও বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে কিছু প্রস্তাবে ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
আলী রীয়াজের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ভিন্নমতের বিষয় গোপন রাখা হয়নি। সনদে কোন কোন বিষয়ে কোন দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়েছিল। আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়েও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান প্রকাশ্যে এসেছে।
তাঁর মতে, গণভোটের মাধ্যমে নাগরিকদের সামনে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল। জনগণকে জানানো হয়েছিল, তারা প্রস্তাবিত পরিবর্তন চান কি না। ফলে সনদে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও গণভোট আয়োজনকে প্রতারণা বলার সঙ্গে তিনি একমত নন।
তিনি আরও বলেন, গণভোটে যদি সংস্কার প্রস্তাবের বিপক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসত, তাহলে সেই ফল মেনে নেওয়ার প্রয়োজন হতো। কারণ, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছাই শেষ কথা নয়; নাগরিকদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি চাওয়া হয়েছিল। ফলে গণভোটের ফলকে রাজনৈতিক সমঝোতার বাইরে একটি পৃথক জনমত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
আবার গণভোটের প্রয়োজন আছে কি?
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে পুনরায় গণভোট আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, সরকার চাইলে বিভিন্ন বিষয়ে গণভোট আয়োজন করতে পারে। তবে তাঁর প্রশ্ন, যে সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে নাগরিকেরা ইতিমধ্যে মত দিয়েছেন, সেই একই বিষয়ে আবার গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
তিনি বলেন, গণভোটে নাগরিকেরা যে রায় দিয়েছেন, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন ভোটার যুক্ত হলেও আগের ভোটারদের দেওয়া রায় অকার্যকর হয়ে যায় না। ফলে পুনরায় গণভোটের প্রস্তাবের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকা প্রয়োজন।
আলী রীয়াজের মতে, ভবিষ্যতে সংবিধানের যেসব বিষয়ে গণভোটের বাধ্যবাধকতা থাকবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু আগে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলকে উপেক্ষা করার উপায় হিসেবে নতুন গণভোটকে ব্যবহার করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, সরকার যদি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আবার গণভোট আয়োজন করতে চায়, তা করতে পারে। কিন্তু নতুন গণভোট আয়োজনের ফলে আগের গণভোটের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না।
তবে পুনরায় গণভোট আয়োজনের আইনগত সুযোগ, এর প্রশ্নের ধরন এবং আগের গণভোটের ফলের সঙ্গে নতুন ফলের সম্পর্ক নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এ বিষয়ে আলী রীয়াজের অবস্থান হলো, জনগণের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
গণভোটের বৈধতা ও সাংবিধানিক প্রশ্ন
গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে একসময় গণভোটের বিধান ছিল। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে তা যুক্ত হয়েছিল এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আদালতের সিদ্ধান্তের ফলে বিধানটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। এ ছাড়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অন্যান্য বিষয়েও গণভোট আয়োজন করা সম্ভব।
তবে গণভোটের বিধান কীভাবে কার্যকর রয়েছে, কোন বিষয়ে গণভোট বাধ্যতামূলক এবং জুলাই জাতীয় সনদের গণভোটের ফল কীভাবে সংবিধান সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান, আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় এবং গণভোটসংক্রান্ত সরকারি নথির ওপর।
এ কারণে গণভোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং তার আইনগত কার্যকারিতাকে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। আলী রীয়াজের বক্তব্যে জনগণের সম্মতিকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রধান নৈতিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; অন্যদিকে এর বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব
জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব নিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, যারা সনদে স্বাক্ষর করেছেন, তাঁদের অঙ্গীকার পালন করাই প্রত্যাশিত। এটি একটি সমঝোতার দলিল। সেই অঙ্গীকার অস্বীকার করার মধ্যে রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে, কিন্তু তা গৌরবের বিষয় নয়।
তাঁর মতে, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা পালন করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। জনগণের সামনে দেওয়া অঙ্গীকার থেকে সরে এলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রাখা প্রয়োজন।
জুলাই জাতীয় সনদকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, সেটিকে কার্যকর রূপ দিতে হলে সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জরুরি বলেও তাঁর বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
রাষ্ট্র সংস্কারের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বর্তমান বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে রয়েছে গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনমত বাস্তবায়নের দাবি; অন্যদিকে রয়েছে সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামো, সংসদের ক্ষমতা এবং সংস্কারের আইনগত পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন।
আলী রীয়াজের বক্তব্যে স্পষ্ট, তাঁর মতে রাষ্ট্র সংস্কারকে বিচ্ছিন্ন কিছু সংশোধনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন করা কঠিন হবে। বরং সনদের সামগ্রিক লক্ষ্য, রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার এবং নাগরিকদের সম্মতিকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে আইনগত বৈধতা, আদালতের এখতিয়ার এবং প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার সীমা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক ঐকমত্যকে কার্যকর সাংবিধানিক কাঠামোয় রূপ দিতে হলে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও আইনসম্মত হওয়া জরুরি।
সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতির মতে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ধীর হলেও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যায়নি। জনগণের রায়কে সম্মান জানানো এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সেই আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে হবে।
সাক্ষাৎকারে তাঁর মূল বার্তা হলো—জুলাই জাতীয় সনদ কেবল স্বাক্ষরিত একটি দলিল হিসেবে পড়ে থাকলে এর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। নাগরিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনের পথে এটিকে কার্যকর করার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরই বর্তায়।

