ঢাকা বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

স্ত্রী দাবি করলেই দিতে হবে দেনমোহর, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম

স্ত্রী দাবি করলেই দিতে হবে দেনমোহর, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

ছবিঃ সংগৃহীত

বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহরের অর্থ বকেয়া রাখলে স্ত্রী দাবি করা মাত্রই তা পরিশোধ করতে হবে স্বামীকে। দেনমোহর আদায়ের জন্য স্ত্রীকে বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা স্বামীর মৃত্যুর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না—এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনো স্বামী দেনমোহর পরিশোধে অযথা গড়িমসি করলে এবং স্ত্রীকে নিজের প্রাপ্য অর্থ আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করলে, সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালত মূল দেনমোহরের পাশাপাশি স্ত্রীকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপির বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান। এর আগে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।

দেনমোহর পরিশোধে আর অপেক্ষা নয়

হাইকোর্টের এই রায়ের মূল বিষয় হলো—বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহর স্ত্রীর আইনগত ও ধর্মীয় অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা পরিশোধ না করে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ নেই।

অর্থাৎ, বিয়ের সময় দেনমোহরের কোনো অংশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা না হলে বকেয়া অংশ স্ত্রী পরবর্তীতে দাবি করতে পারবেন। শুধু বিবাহবিচ্ছেদ, স্বামীর মৃত্যু কিংবা অন্য কোনো বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরই দেনমোহর পরিশোধযোগ্য হবে—এমন ধারণার সুযোগ নেই।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্ত্রী জীবিত ও বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা অবস্থাতেও তাঁর প্রাপ্য দেনমোহর দাবি করতে পারবেন এবং স্বামীর আর্থিক সক্ষমতা থাকলে তা পরিশোধে অযথা বিলম্ব করা উচিত নয়।

আদালতে যেতে বাধ্য করলে ক্ষতিপূরণের সুযোগ

রায়ে হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছেন। কোনো স্বামীর দেনমোহর পরিশোধের আর্থিক সক্ষমতা থাকার পরও তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বা অযথা দীর্ঘ সময় ধরে তা পরিশোধ না করেন এবং শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে নিজের পাওনা আদায়ের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়, তাহলে বিষয়টি আদালত বিবেচনায় নিতে পারবেন।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফ্যামিলি কোর্ট বা পারিবারিক আদালত বকেয়া মূল দেনমোহরের পাশাপাশি স্ত্রীকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে।

অর্থাৎ, স্ত্রীকে তাঁর আইনগত পাওনা আদায়ের জন্য দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করার বিষয়টিকেও আদালত গুরুত্ব দিতে পারবেন।

কোনো আদালত দেনমোহর কমাতে পারবে না

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে আরও বলা হয়েছে, দেওয়ানি চুক্তি বা প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট বিধান ছাড়া কোনো আদালতের দেনমোহরের নির্ধারিত অর্থ কমানো, হ্রাস করা কিংবা মওকুফ করার এখতিয়ার নেই।

বিয়ের সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে দেনমোহর নির্ধারিত হয়েছে, সেটি আইনগতভাবে কার্যকর থাকার বিষয়টি আদালতের পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব পেয়েছে।

ফলে কোনো মামলার বিচার করতে গিয়ে আদালত নিজের বিবেচনায় নির্ধারিত দেনমোহরের অর্থ কমিয়ে দিতে বা মওকুফ করে দিতে পারবেন না—রায়ের পর্যবেক্ষণে এমন বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে।

দেনমোহর কী

মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে দেনমোহর হলো স্ত্রীর প্রাপ্য অর্থ বা সম্পদ, যা বিয়ের সময় স্বামীর ওপর নির্ধারিত হয়। এটি নগদ অর্থ, সম্পদ বা চুক্তিতে নির্ধারিত অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।

দেনমোহরের একটি অংশ বিয়ের সময় পরিশোধ করা হলে অবশিষ্ট অংশ বকেয়া হিসেবে থাকতে পারে। সেই বকেয়া দেনমোহর পরবর্তীতে স্ত্রী দাবি করতে পারেন।

হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে বকেয়া দেনমোহরকে দীর্ঘদিন অনির্দিষ্ট অবস্থায় রেখে দেওয়ার প্রবণতার ক্ষেত্রে আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হলো।

স্বামীর আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় আসবে

রায়ের পর্যবেক্ষণে স্বামীর আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ, দেনমোহর পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা পরিশোধ না করেন, তাহলে আদালত সেই আচরণকে বিবেচনায় নিতে পারবেন।

বিশেষ করে স্ত্রী তাঁর প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার জন্য আদালতে মামলা করতে বাধ্য হলে এবং স্বামীর পক্ষ থেকে অযৌক্তিক বিলম্বের বিষয়টি প্রতীয়মান হলে, মূল দেনমোহরের বাইরে ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

এতে দেনমোহর পরিশোধকে শুধু ভবিষ্যতের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত না করে বৈবাহিক সম্পর্ক চলাকালীন স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার হিসেবে দেখার বিষয়টি আরও জোরালো হয়েছে।

বিবাহবিচ্ছেদ বা মৃত্যুর অপেক্ষা করতে হবে না

দেনমোহর নিয়ে প্রচলিত একটি ধারণা হলো—স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হলে কিংবা স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহর পরিশোধের বিষয়টি সামনে আসে। হাইকোর্টের এই রায় সেই ধারণাকে গুরুত্বপূর্ণভাবে পরিষ্কার করেছে।

রায়ের আলোকে, স্ত্রী তাঁর বকেয়া দেনমোহর জীবিত স্বামীর কাছেই দাবি করতে পারবেন। এজন্য বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া বা স্বামীর মৃত্যুর মতো পরিস্থিতির অপেক্ষা করা প্রয়োজন নেই।

ফলে বৈবাহিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন থাকা অবস্থাতেই স্ত্রী তাঁর প্রাপ্য দেনমোহর দাবি করতে পারবেন এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা আদায়ের সুযোগ রয়েছে।

পারিবারিক আদালতে দেনমোহর আদায়ের পথ

দেনমোহর নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করা যায়। আদালত মামলার নথি, বিয়ের কাবিননামা, দেনমোহরের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেনমোহর আদায়ের জন্য স্ত্রীকে অযথা হয়রানি বা দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ফেলা উচিত নয়। বরং স্বামীর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা হলে তার আর্থিক পরিণতিও আদালত বিবেচনা করতে পারবেন।

নারীর অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

আইনজীবীদের মতে, হাইকোর্টের এই রায় দেনমোহরকে শুধু বিবাহবিচ্ছেদ বা উত্তরাধিকার-সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেই স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার হিসেবে বিবেচনার পথ আরও স্পষ্ট করেছে।

বিশেষ করে আর্থিকভাবে স্বামীর ওপর নির্ভরশীল স্ত্রীদের ক্ষেত্রে বকেয়া দেনমোহর পরিশোধ না করার কারণে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ সেই অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট মামলায় দেনমোহর, ক্ষতিপূরণ বা অন্যান্য প্রতিকারের পরিমাণ ও প্রযোজ্যতা সংশ্লিষ্ট মামলার তথ্য, প্রমাণ এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর দেনমোহর পরিশোধ, বকেয়া দেনমোহর আদায় এবং এ বিষয়ে পারিবারিক আদালতের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!