কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার দিকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ৩ নম্বর ইউনিটে এ ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
মৃত রোগীর নাম আতিয়ার শেখ (৬৫)। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের সাঁওতা গ্রামের বাসিন্দা।
চিকিৎসার আগেই রোগীর মৃত্যু
রোগীর স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, হৃদরোগে আক্রান্ত অবস্থায় আতিয়ার শেখকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার ইসিজি করানোর পরামর্শ দেন। তবে ইসিজি করার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসা প্রক্রিয়া নিয়ে স্বজনদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা চিকিৎসায় বিলম্ব হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ নিয়ে চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে প্রথমে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
পরে হাসপাতাল চত্বরে জড়ো হন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা
প্রথম দফার উত্তেজনার খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল চত্বরে জড়ো হন। পরে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে তাদের আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, আতিয়ার শেখকে এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা হয়েছিল। এ কারণে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা যায়নি বলে তারা দাবি করেন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেওয়ার পরপরই রোগীর মৃত্যু হলে তারা বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানান।
স্বজনদের আরও অভিযোগ, তারা চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তুললে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক তাদের ওপর চড়াও হন এবং মারধর করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আকুল উদ্দিন বলেন, আতিয়ার শেখ অত্যন্ত গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে এসেছিলেন। চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর পরপরই তার মৃত্যু হয়।
তিনি বলেন, রোগীর চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি ছিল না। বরং রোগীর স্বজনদের মারধরে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, রোগী গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছিল। তবে তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন থাকায় চিকিৎসা শুরুর পরপরই মৃত্যু ঘটে।
তিনজনকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ
ঘটনার খবর পেয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেন জানান, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগের ভিত্তিতে মৃত রোগীর ছেলেসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না—এমন অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ তদন্তের দাবি
রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসকদের সংঘর্ষের ঘটনায় হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এমন ঘটনায় একদিকে যেমন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে রোগীর মৃত্যুর কারণ ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া নিয়ে স্বজনদের কোনো অভিযোগ থাকলে সেটিও যথাযথভাবে তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি উঠেছে।
ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। রোগীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল কি না এবং সংঘর্ষের জন্য কারা দায়ী—এসব বিষয় তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।

