সরকারের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে অযথা বাধা সৃষ্টি না করে গঠনমূলক সমালোচনা ও দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতির চর্চা করতে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
তিনি বলেছেন, এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তি সুবিধা পেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল আয়োজিত প্রতিবাদ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন নজরুল ইসলাম খান।
‘বিরোধীদলের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের’ প্রতিবাদে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
‘নিছক বিরোধিতায় কোনো লাভ নেই’
সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকা প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম খান বলেন, শুধু বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করলে জনগণের কোনো কল্যাণ হবে না। সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীলভাবে কথা বলা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘নিছক বিরোধিতায় কোনো লাভ নেই। সংসদ সদস্যদের প্রতি অনুরোধ করবো, আপনারা ফ্যাসিবাদের মতো আচরণ করবেন না। চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলুন এবং কমন শত্রুর ক্ষেত্রে ঐক্য প্রকাশ করুন।’
তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধিতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হলেও রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
সরকারের কাজে বাধা দিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে
সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে বাধা সৃষ্টি হলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির এই নেতা।
তিনি বলেন, সরকারের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে ঢালাও বিরোধিতা না করে যেখানে প্রয়োজন সেখানে গঠনমূলক সমালোচনা করা উচিত। একই সঙ্গে ভুলত্রুটি থাকলে তা তুলে ধরে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্য, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে সেই মতপার্থক্য যেন রাষ্ট্র পরিচালনা ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।
গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য জনগণের সমর্থন
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে জনগণের ভোট ও সমর্থনের কথা তুলে ধরেন নজরুল ইসলাম খান।
তিনি বলেন, রাজনীতিতে জনগণের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া কিংবা বিরোধী দলে থাকা—দুটিই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ। জনগণের রায়কে সম্মান করা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই পরিচালনা করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে। এসব বক্তব্য বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন।
‘বিএনপি জনগণের সঙ্গে বেইমানি করেনি’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি কখনো জনগণের সঙ্গে বেইমানি করেনি। বিভিন্ন জাতীয় সংকট ও রাজনৈতিক দুঃসময়ে দলটির নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, জনগণের সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে দলের ভূমিকার কারণে জনগণ বিভিন্ন সময়ে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যাপক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে দলটি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে। এসব ত্যাগের বিষয় জনগণ বিবেচনায় নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে’
বক্তব্যে সাম্প্রতিক নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগকে জনগণ মূল্যায়ন করেছে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে দলটিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
তার মতে, জনগণের দেওয়া এই দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি বিএনপির জন্যও বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব তৈরি করেছে। সেই দায়িত্ব পালনে অর্থনীতি শক্তিশালী করা, জনকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
অর্থনীতি ও জনকল্যাণে কাজ করার দাবি
বিএনপি শুধু রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে না, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়েও কাজ করছে বলে দাবি করেন নজরুল ইসলাম খান।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের আহ্বান
সমাবেশের বক্তব্যের শেষভাগে নজরুল ইসলাম খান দেশের স্বার্থবিরোধী যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে কেউ যাতে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে, সে বিষয়ে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের এই কর্মসূচিতে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং দলীয় অবস্থানের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

