দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই আবারও বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।
ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় কোনো কারণে যারা টিকা নিতে পারেনি বা টিকাদান থেকে বাদ পড়েছে, তাদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা। বিভিন্ন কারণে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকাদান কেন্দ্রে যেতে না পারায় তাদের হাম ও রুবেলার মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি থেকে যায়।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম বলেন, এ কর্মসূচিকে ‘মপআপ প্রোগ্রাম’ বলা হচ্ছে। মপআপের মাধ্যমে যারা কোনো কারণে টিকা থেকে বাদ পড়েছে, টিকার বিষয়ে জানত না অথবা লজিস্টিক সমস্যার কারণে টিকাদান কেন্দ্রে আসতে পারেনি—তাদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা হয়।
তার মতে, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকা দেওয়া এই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
নিয়মিত টিকার পাশাপাশি অতিরিক্ত ডোজ
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. হালিমা বলেন, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময়ে এমআর (মিজলস-রুবেলা) টিকা নিতে হবে। এর পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের অতিরিক্ত ডোজও নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, শিশুদের শরীরে হাম ও রুবেলার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরিতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাবা-মাকে নির্ধারিত সময়ে সন্তানকে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
ডা. হালিমা বলেন, ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সে নির্ধারিত এমআর টিকা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ ক্যাম্পেইনে হাম-রুবেলার অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার সুযোগ থাকলে অভিভাবকদের সেটিও গ্রহণ করা উচিত।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ এই টিকা কর্মসূচি
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। টিকা না নেওয়া বা টিকার পূর্ণ সুরক্ষা না থাকা শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
এ কারণে নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি কোনো এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়লে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিশুদের টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া জরুরি।
৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুরা পাবে টিকা
এবারের বিশেষ ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বড় একটি অংশ এই কর্মসূচির আওতায় আসবে।
নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো শিশু বাদ পড়ে থাকলে অভিভাবকদের বিশেষ ক্যাম্পেইনের সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো শিশু আগে নিয়মিত টিকা নিয়ে থাকলেও ক্যাম্পেইনের নির্ধারিত বয়সসীমা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অতিরিক্ত ডোজের প্রয়োজন হলে তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে সারা দেশে বড় টিকাদান কর্মসূচি
এর আগে ইউনিসেফ, গ্যাভি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারা দেশে হামের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়।
ওই কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে শিশুদের হাম ও রুবেলার বিরুদ্ধে সুরক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বিভিন্ন কারণে বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে টিকার আওতায় আনার প্রয়োজন থাকায় এবার আবারও বিশেষ মপআপ কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।
অভিভাবকদের টিকাদান কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ নিলেই টিকাদান কর্মসূচি সফল হবে না। শিশুদের সময়মতো টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের পরামর্শ, নির্ধারিত বয়সের শিশুদের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দ্বিধা না করে সংশ্লিষ্ট টিকাদান কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। নিয়মিত টিকার পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় শিশুর অতিরিক্ত ডোজ প্রয়োজন কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শনিবার থেকে শুরু হয়ে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা বিশেষ এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর সুরক্ষা তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের।

