জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ফ্লাইটটি নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। এ সময় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীসহ বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। তাদের স্লোগানে বিমানবন্দর এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।
বিমানবন্দর থেকে মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে নিউইয়র্কের ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সফরকালে তিনি এই হোটেলেই অবস্থান করবেন।
তবে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের সময় বিমানবন্দরের বাইরে পাল্টাপাল্টি স্লোগানের ঘটনাও ঘটে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্র শাখার ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়।
২২ সেপ্টেম্বর শুরু আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি
নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর। সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য দেওয়া স্বাগত প্রাতঃরাশে অংশ নেবেন তিনি।
এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার।
জলবায়ু ও বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে বক্তব্য
২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে অংশ নেবেন। একইদিন ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের উদ্যোগে আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলাবিষয়ক একটি সভায় বক্তব্য দেবেন তিনি।
বিকেলে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সমস্যা, ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তর এবং জলবায়ু অর্থায়নের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ
২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে রয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে ভাষণ। একইদিন তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই সভায় জলবায়ু অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো তুলে ধরার কথা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা এবং ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়নের বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশ আয়োজিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক সাইড ইভেন্টে বক্তব্য দেবেন তিনি। সেখানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে ঢাকা। জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনকে সেই প্রচেষ্টা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য নিয়ে আলাদা সাইড ইভেন্ট
২৪ সেপ্টেম্বর মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি কয়েকটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কর্মসূচিতে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি রয়েছে।
এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উন্নয়ন সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। পাশাপাশি ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সফরসূচির অংশ হিসেবে তিনি ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী এবং মেটাসহ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এসব আলোচনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, উৎপাদন ও অবকাঠামো খাতের সম্ভাবনা, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এসব বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার উদ্দেশে রওনা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের কর্মসূচি শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টার দিকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ছাড়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে তারেক রহমানের এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। ফলে এবারের সফরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির বিভিন্ন বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

