জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্ক সফরে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চার দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, সফরজুড়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, চারটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট, ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার দিনের সফরে মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন।
জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্ব পেয়েছে
মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, ‘পরম আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিটি দেশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গ্রহণ করেছেন।’
ওয়াল স্ট্রিটে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক
নিউইয়র্ক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক। জেপি মরগান চেজের আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রাতরাশ বৈঠকে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পায়।
মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের সঙ্গে বৈঠক
মাহদী আমিন জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। তিনি কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা, আরও জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পায়।
তিন দেশই প্রধানমন্ত্রীকে নিজ নিজ দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, সরকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায়। বিশেষ করে জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটিতে বক্তব্য দেন। একই সময়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবাধিকার, রোহিঙ্গা সংকট, বিশ্বশান্তি এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।
মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়েও আলোচনা
ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয় গুরুত্ব পায়।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আয়োজন
নিউইয়র্ক সফরে বাংলাদেশের উদ্যোগে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হয়।
এ ছাড়া মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি নিয়েও বাংলাদেশের উদ্যোগে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন, জাস্ট ট্রানজিশন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বৈশ্বিক ইস্যু নিয়েও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের আয়োজনে বক্তব্য দেন।
উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সহযোগিতায় জোর
সফরকালে গেটস ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউট এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন অংশীদার ও স্থানীয় কমিউনিটির বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তিনি অংশ নেন।
বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, বিনিয়োগের সুযোগ, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন দিক আলোচনায় আসে।
প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর অংশগ্রহণ
প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন। মাহদী আমিন জানান, তিনি মোট আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং এর চারটিতে বক্তব্য দেন।
প্ল্যাটফর্ম অব উইমেন লিডার্স, ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগ এবং মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিতে তাঁর বক্তব্য বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের প্রশংসা পেয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
চার দিনে প্রায় ৮০ কর্মসূচি
মাহদী আমিন বলেন, চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রায় ৮০টি বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
তিনি বলেন, ছোট একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রতিটি কর্মসূচিতেই বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে যারা ছিলেন
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মর্তুজা, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
চার দিনের এই সফরের বিভিন্ন বৈঠক ও কর্মসূচিতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক শান্তির মতো একাধিক বিষয় উঠে আসে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

