বাংলাদেশের ই-পাসপোর্টের নকশায় আনা হচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তন। নতুন নকশার মাধ্যমে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস, জাতীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নথিতে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও মোহাম্মদ ওয়াসিমের স্মৃতি পাসপোর্টের জলছাপে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
রোববার (১৯ জুলাই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে নতুন নকশা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ই-পাসপোর্টের ভেতরের পাতার জলছাপে পরিবর্তন এনে সেখানে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং ওই আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন সংযোজন করা হবে। বিশেষ করে পাসপোর্টের ৩২ ও ৩৩ নম্বর পাতায় জলছাপ হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীকী দৃশ্য এবং শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও মোহাম্মদ ওয়াসিমের স্মৃতি স্থান পাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নথিতেও সংরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম এবং বিদেশিদের কাছেও দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিই নয়, নতুন পাসপোর্টের নকশায় দেশের ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যেরও বিস্তৃত উপস্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন পাতায় জলছাপ হিসেবে স্থান পাচ্ছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় সংসদ ভবন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ছবি।
এ ছাড়া ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির, পুরান ঢাকার লালবাগ দুর্গ, নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পানাম নগর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক কার্জন হলের ছবি।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের প্রতিফলন ঘটাতে নতুন নকশায় রাখা হয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, বান্দরবানের নীলগিরি এবং উপকূলীয় ঝাউবনের দৃশ্য।
জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও বেশ কয়েকটি উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় পাখি দোয়েল, জাতীয় মাছ ইলিশ এবং জাতীয় ফল কাঁঠালের জলছাপ।
শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করতে নতুন নকশায় স্থান পেয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বাংলাদেশের শিল্প-ঐতিহ্য ও মুক্তচেতনার প্রতীক হিসেবে নতুন পাসপোর্টে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাসপোর্টের ডাটা পেইজে বিদ্যমান নীতিই বহাল থাকবে। অর্থাৎ, ‘ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ’—এই ঘোষণা আগের মতোই নতুন পাসপোর্টেও থাকবে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নকশা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংযোজন এবং মুদ্রণ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। পর্যায়ক্রমে নতুন নকশার ই-পাসপোর্ট নাগরিকদের মধ্যে বিতরণ শুরু হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন এই নকশা শুধু একটি ভ্রমণ নথির পরিবর্তন নয়; বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের স্মৃতি এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

