চট্টগ্রাম বন্দরে তামাকসদৃশ সামগ্রী, জর্দার ঘোষণায় মাদকসদৃশ বিভিন্ন রঙের পাউডারজাত পদার্থ এবং সন্দেহজনক স্ক্র্যাপ পেপারের বড় একটি চালান আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। চালানটির কাগজপত্রে এক প্রতিষ্ঠানের নাম আমদানিকারক হিসেবে ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক ওই চালানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) চালানটি আটকের তথ্য জানায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। কাস্টমসের প্রাথমিক পরীক্ষায় দুটি বিল অব লেডিংয়ের আওতায় থাকা চালান থেকে মোট ২ হাজার ৪০ প্যাকেজে ১৭ হাজার ৫১৩ দশমিক ৪ কেজি, অর্থাৎ প্রায় ১৭ দশমিক ৫১ মেট্রিক টন পণ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে প্রায় ৮ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন তামাক বা তামাকসদৃশ সামগ্রী এবং বিভিন্ন রঙের সন্দেহজনক পাউডারজাত পদার্থ রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৯ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন সন্দেহজনক স্ক্র্যাপ পেপার পাওয়া গেছে।
আমদানিকারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চালানের কাগজপত্রে আমদানিকারক হিসেবে অথৈ এন্টারপ্রাইজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তিনি বা তার প্রতিষ্ঠান ওই পণ্য আমদানির বিষয়ে কিছুই জানেন না।
তার দাবি, চালানটির সঙ্গে অথৈ এন্টারপ্রাইজের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার আশঙ্কা, কোনো অসাধু চক্র তার প্রতিষ্ঠানের নাম ও আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে পণ্যগুলো দেশে এনেছে।
এ ঘটনায় প্রকৃত আমদানিকারক ও চালানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে আসে চালান
কাস্টমস নথি অনুযায়ী, চালানটি কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। সংশ্লিষ্ট জাহাজটি ২০ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে যাত্রা করে এবং ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়।
চালানটির সঙ্গে দুটি বিল অব লেডিং বা বিএল পাওয়া যায়। এর একটিতে পণ্যের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল—“PAN MASALA AND ZARDA (CHEWING TOBACCO PRODUCT)”।
নথিতে ওই চালানের ৪৭৩ প্যাকেজের মোট গ্রস ওয়েট দেখানো হয়েছিল ৮ হাজার ৯৭৪ কেজি। তবে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) কায়িক পরীক্ষায় ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে থাকা সামগ্রীর উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ধরা পড়ে।
৪৭০ প্যাকেজে পাওয়া যায় ৮.২৫ টন তামাকসদৃশ সামগ্রী
কায়িক পরীক্ষায় ৪৭০ প্যাকেজে মোট ৮ হাজার ২৫০ দশমিক ৪ কেজি, অর্থাৎ প্রায় ৮ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন Tobacco বা Tobacco-like item পাওয়া যায়।
এর মধ্যে—
Dark Brown: ৪২১ প্যাকেজে ৭ হাজার ৩২৫ দশমিক ৪ কেজি
Brown: ৩১ প্যাকেজে ৫২৭ কেজি
Grey: ১৩ প্যাকেজে ২৭৩ কেজি
White: ৫ প্যাকেজে ১২৫ কেজি
কাস্টমসের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এসব সামগ্রীর একটি অংশ বিভিন্ন রঙের পাউডারজাত পদার্থ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে, যা বাহ্যিকভাবে মাদকদ্রব্যের মতো সন্দেহজনক বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
তবে কাস্টমস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব পদার্থে প্রকৃতপক্ষে কোনো মাদকদ্রব্য, নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত উপাদান রয়েছে কি না, তা কেবল দৃশ্যমান পরীক্ষা বা বাহ্যিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য নমুনা সংগ্রহ করে রাসায়নিক ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফলের পরই এসব পদার্থের প্রকৃত রাসায়নিক পরিচয় এবং সেগুলো মাদক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রিত উপাদানের আওতায় পড়ে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
‘PRINTED PAPER CATALOGUE’ ঘোষণায় মিলেছে স্ক্র্যাপ পেপার
চালানের দ্বিতীয় বিল অব লেডিংয়ে পণ্যের ঘোষণা ছিল “PRINTED PAPER CATALOGUE”।
কাস্টমস নথিতে এ চালানের ১ হাজার ৫৭০ প্যাকেজের গ্রস ওয়েট দেখানো হয়েছিল ৯ হাজার ৮৫৯ দশমিক ৬০ কেজি। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় এসব প্যাকেজে ঘোষিত পণ্যের পরিবর্তে সন্দেহজনক Scrap Paper পাওয়া যায়।
পরীক্ষায় ১ হাজার ৫৭০ প্যাকেজে মোট ৯ হাজার ২৬৩ কেজি, অর্থাৎ প্রায় ৯ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন স্ক্র্যাপ পেপার পাওয়া গেছে।
ফলে আমদানি নথিতে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের প্রকৃতি, শ্রেণিবিন্যাস ও ওজনের মধ্যে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ বিষয়টিও কাস্টমসের তদন্তের আওতায় এসেছে।
দুই চালানে মোট ১৭.৫১ টন পণ্য
দুটি বিল অব লেডিং মিলিয়ে কায়িক পরীক্ষায় মোট ২ হাজার ৪০ প্যাকেজে ১৭ হাজার ৫১৩ দশমিক ৪ কেজি পণ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে—
প্রথম চালান: প্রায় ৮ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন তামাক বা তামাকসদৃশ সামগ্রী এবং সন্দেহজনক পাউডারজাত পদার্থ।
দ্বিতীয় চালান: প্রায় ৯ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন সন্দেহজনক স্ক্র্যাপ পেপার।
অর্থাৎ দুটি চালানে মোট প্রায় ১৭ দশমিক ৫১ মেট্রিক টন পণ্য কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষায় ধরা পড়েছে।
প্রকৃত আমদানিকারক শনাক্তে তদন্ত
এক প্রতিষ্ঠানের নাম ও আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে অন্য কেউ চালানটি দেশে এনেছে কি না, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের এতটা পার্থক্যের কারণ এবং চালানটির প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কেও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তদন্তে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নাম ও তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, চালানটির প্রকৃত আমদানিকারক বা নিয়ন্ত্রক কারা এবং পণ্যের ঘোষণায় অসামঞ্জস্যের পেছনে কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
বিশেষ করে সন্দেহজনক পাউডারজাত সামগ্রীর রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরীক্ষায় নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত কোনো উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চালানটির পণ্য জব্দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই, নমুনা পরীক্ষা এবং প্রকৃত সংশ্লিষ্টদের শনাক্তে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

