ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

চট্টগ্রাম বন্দরে গতি বেড়েছে, ছয় মাসে রাজস্ব আয় বাড়ল প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ১০:১০ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরে গতি বেড়েছে, ছয় মাসে রাজস্ব আয় বাড়ল প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমে গতি বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাস ১১ দিনে কনটেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিং বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি কনটেইনারবাহী জাহাজের বন্দরে প্রবেশের অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইমেও এসেছে উন্নতি। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বন্দরের রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেটি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, দ্রুত কনটেইনার খালাস, অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জাহাজ ব্যবস্থাপনায় উন্নতির ফলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে। তবে একই সময়ে মোট কার্গো হ্যান্ডলিং সামান্য কমে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বাড়ছে কনটেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিং

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১১ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ১৪৪ লাখ টিইইউএস। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২ দশমিক ৪১ লাখ টিইইউএস।

বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের ওঠানামা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।

একই সময়ে জাহাজ হ্যান্ডলিংও বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাস ১১ দিনে যেখানে ২ হাজার ৫৮৮টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছিল, চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩৫টিতে। অর্থাৎ এক বছরে জাহাজ হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৪৭টি বা প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ।

কমেছে জাহাজের অপেক্ষার সময়

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে কনটেইনারবাহী জাহাজের অপেক্ষার সময় কমে যাওয়ায়।

২০২৫ সালে একটি কনটেইনার জাহাজকে বন্দরে প্রবেশের জন্য গড়ে ৪ দশমিক ০৮ দিন অপেক্ষা করতে হতো। চলতি বছরে সেই সময় কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২৩ দিনে।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমেছে ২ দশমিক ৮৫ দিন। শতাংশের হিসাবে এই হ্রাস প্রায় ৭০ শতাংশ।

বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, জাহাজের আগমন পরিকল্পনা, জেটি ব্যবস্থাপনা, পণ্য খালাসে দ্রুততা এবং অপারেশনাল সমন্বয় বাড়ার কারণেই অপেক্ষার সময় কমেছে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সময় ও পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

টার্নঅ্যারাউন্ড টাইমেও উন্নতি

শুধু জাহাজের অপেক্ষার সময় নয়, বন্দরে প্রবেশের পর প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে জাহাজের বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও কমেছে।

২০২৫ সালে একটি জাহাজের গড়ে টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ছিল ২ দশমিক ৬০ দিন। চলতি বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২৮ দিনে। অর্থাৎ টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমেছে শূন্য দশমিক ৩২ দিন বা প্রায় ১২ শতাংশ।

বন্দর ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের উন্নতি জাহাজের কার্যকর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডুয়েলিং টাইমে বড় পরিবর্তন নেই

তবে আমদানি করা কনটেইনার বন্দরে অবস্থানের সময় বা ডুয়েলিং টাইমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।

২০২৫ সালে কনটেইনারের গড় ডুয়েলিং টাইম ছিল ৯ দশমিক ৫৬ দিন। চলতি বছরে তা সামান্য কমে ৯ দশমিক ৫১ দিনে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৫ দিন। ফলে বন্দরের ভেতরে পণ্য খালাসের পাশাপাশি আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য ছাড়িয়ে নেওয়া নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে সামান্য পতন

কনটেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিং বাড়লেও মোট কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে সামান্য পতন হয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে ৮৪ দশমিক ২১ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ৫১ মিলিয়ন মেট্রিক টনে।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট কার্গো হ্যান্ডলিং কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের এই সামান্য পতনের পেছনে আমদানি-রপ্তানি প্রবাহ, পণ্যের ধরন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রভাব থাকতে পারে।

ছয় মাসে রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখা গেছে রাজস্ব আয়ে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে রাজস্ব আয় হয়েছিল ২ হাজার ৯৪৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় বেড়েছে ৯৯৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কার্যক্রমে গতি বৃদ্ধি, জাহাজ ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অপারেশনাল ব্যবস্থাপনার উন্নতি রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

ব্যয় কমেছে, বেড়েছে রাজস্ব উদ্বৃত্ত

রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি বন্দরের রাজস্ব ব্যয়ও কমেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব ব্যয় ছিল ১ হাজার ৪৪৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৯১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব ব্যয় কমেছে ৫৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এর ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বা রাজস্ব উদ্বৃত্তে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৫০১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৫৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত বেড়েছে ১ হাজার ৫৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি ৭০ দশমিক ২৩ শতাংশ।

এক জাহাজে রপ্তানি কনটেইনার জাহাজীকরণে নতুন রেকর্ড

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা দিয়েছে এক জাহাজে সর্বোচ্চ রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজীকরণের নতুন রেকর্ড।

গত ১২ আগস্ট জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) ১১ নম্বর জেটি থেকে মার্স্ক লাইনের ‘মারস্ক বিন্টুলু’ জাহাজে ৯৩৩ বক্স রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার লোড করা হয়। এসব কনটেইনারে মোট ১ হাজার ৭৮৪ টিইইউএস রপ্তানি পণ্য ছিল।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এক জাহাজে রপ্তানি পণ্যবাহী লোড কনটেইনার জাহাজীকরণের ক্ষেত্রে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড।

এর আগে গত ১৮ জুন এক জাহাজে সর্বোচ্চ ৭৪২ বক্স বা ১ হাজার ৪৩৯ টিইইউএস রপ্তানি পণ্যবাহী লোড কনটেইনার জাহাজীকরণের রেকর্ড হয়েছিল।

‘মারস্ক বিন্টুলু’তে এর বাইরে ১৪৪ বক্স খালি কনটেইনারও জাহাজীকরণ করা হয়, যা ১৪৭ টিইইউএসের সমান। সব মিলিয়ে জাহাজটিতে ১ হাজার ৭৭ বক্স কনটেইনার জাহাজীকরণ হয়েছে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৯৩১ টিইইউএস।

বন্দরের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসংখ্যান বলছে, জাহাজ হ্যান্ডলিং, অপেক্ষার সময় এবং টার্নঅ্যারাউন্ড টাইমের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় ও উদ্বৃত্তে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বন্দরের আর্থিক সক্ষমতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে মোট কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে পতন, কনটেইনার ডুয়েলিং টাইমে প্রায় অপরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ প্রবাহ এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জাহাজ দ্রুত খালাস করলেই বন্দরের সক্ষমতা পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো যাবে না। বন্দরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কাস্টমস, শিপিং এজেন্ট, আমদানিকারক-রপ্তানিকারক, ডিপো ও পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা কমানো গেলে বন্দরের সক্ষমতা ও রাজস্ব—দুই ক্ষেত্রেই আরও বড় প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, গত ছয় মাসে বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও রাজস্ব আয় বেড়েছে। পুরো বছরে এ সাফল্য আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!