বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে এ খাতের অবদান দীর্ঘদিনের। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটই এখন অনেক উদ্যোক্তার কাছে নতুন করে ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটকে ঘিরে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের একটি অংশের অভিযোগ, বন্ড সুবিধা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, নথি যাচাইয়ের নামে হয়রানি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সংস্কৃতি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রামাণ্য যাচাই প্রয়োজন।
রপ্তানির মূল ভিত্তি, অথচ বন্ড ব্যবস্থাপনায় জটিলতা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৮০-এর দশকে এটি দ্রুত রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে বিকশিত হয়। বর্তমানে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কারণে এই খাতকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করতে পারে এবং আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য নির্ধারিত নিয়মে বিদেশে রপ্তানি করতে পারে—সে উদ্দেশ্যেই বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থা।
কিন্তু উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে বন্ড ব্যবস্থাপনায় বিধি-বিধানের স্তর বাড়লেও সেবার গতি বাড়েনি। বরং নতুন নতুন অনুমোদন, প্রত্যয়ন, প্রাপ্যতা, অডিট ও নথিপত্রের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘ সময় অফিসে ঘুরতে হয়।
একটি পরিদর্শনকে ঘিরে প্রশ্ন
সম্প্রতি চট্টগ্রামের তৈরি পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান মেসার্স স্যানটেক্স নিটওয়্যারস লিমিটেড, এ.কে. টাওয়ার, ৬/এ, সিডিএ মার্কেট, পাহাড়তলী, চট্টগ্রামকে ঘিরে এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের একটি পরিদর্শন দল আকস্মিকভাবে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে রিভলভিং পদ্ধতিতে প্রাপ্যতার একটি প্রত্যয়নপত্রকে ‘জাল’ বলে দাবি করে।
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট প্রত্যয়নপত্র যথাযথ প্রক্রিয়ায় ইস্যু হয়েছিল এবং সেটি দীর্ঘদিন কমিশনারেটের ওয়েবসাইটেও প্রদর্শিত ছিল। তাহলে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি সরকারি প্রত্যয়নপত্র কীভাবে পরবর্তীতে জাল হিসেবে চিহ্নিত হলো—এ প্রশ্নই তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরপরই সংশ্লিষ্ট প্রত্যয়নপত্র ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা কাঁচামালের হিসাব চাওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা প্রয়োজনীয় নথি উপস্থাপন করলে পরিদর্শন দল কাঁচামালের মজুদ নির্ধারিত ওয়্যারহাউসে দেখতে পায় এবং হিসাব যাচাই করে সেগুলো সিলগালা করে। কাস্টমসের অনুমোদন নিয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়।
অন্যদিকে, কাস্টমস বন্ড সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করেছে। একই সঙ্গে আগের কিছু প্রত্যয়নপত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এখানেই বড় প্রশ্ন—কোনটি সত্য? যদি প্রত্যয়নপত্র জাল হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হলো? আর যদি সরকারি ব্যবস্থায় যাচাই করে প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে দায় কার?
রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আরও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে, পরিদর্শনের আগেই তাদের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা ‘লক’ করে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে বিদেশি ক্রেতার জন্য প্রস্তুত করা পণ্য নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি।
একটি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কয়েক দিনের বিলম্বও বড় ধরনের বাণিজ্যিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকে জাহাজীকরণের সময়সূচি, ক্রেতার ডেলিভারি কমিটমেন্ট, ব্যাংকিং কার্যক্রম, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং ভবিষ্যৎ অর্ডার।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রায় ১৭ দিন পর সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়।
এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—কোনো বন্ড-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত চলাকালে রপ্তানি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক? আমদানি সংক্রান্ত ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ রেখে রপ্তানি সচল রাখার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিদেশি ক্রেতার আস্থায় আঘাত
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, রপ্তানি বিলম্বিত হওয়ায় দীর্ঘদিনের বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকজন ক্রেতা সতর্কবার্তা দিয়েছে এবং সম্ভাব্য কিছু অর্ডার বাতিলও হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রপ্তানি খাতের বাস্তবতায় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রেতার সম্পর্ক তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে সেই সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে খুব দ্রুত।
একজন উদ্যোক্তার ভাষায়, ব্যবসা সম্প্রসারণে সরকারের সব দপ্তরের ভূমিকা হওয়া উচিত ‘সহায়ক শক্তি’র মতো। কোনো সমস্যায় প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দেওয়ার আগে দ্রুত সমাধানের পথ বের করা প্রয়োজন।
২৬ জুলাইয়ের বৈঠকের প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন
প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার কয়েকদিন পর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের একজন কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপ কলে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিকে দপ্তরে আসার জন্য বলেন এবং বিষয়টি অভ্যন্তরীণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থানে পরিবর্তন আসে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে—যদি বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি বা নথি-সংক্রান্ত জটিলতা হয়, তাহলে স্বচ্ছ ও লিখিত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সমঝোতার প্রয়োজন কেন হলো? আবার যদি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ থাকে, তাহলে সেটি যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি না করে সমঝোতার উদ্যোগ কেন?
‘নথি নেই’—এই দায় কার?
ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কখনো অডিট ফাইল পাওয়া যাচ্ছে না, কখনো লাইসেন্স ফাইলের নথি নেই—এমন বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এটি সত্য হলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সংবেদনশীল সরকারি দপ্তরের জিম্মায় থাকা লাইসেন্স, অডিট, প্রত্যয়নপত্র ও আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত নথির নিরাপদ সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই দায়িত্ব।
কোনো নথি সত্যিই হারিয়ে গেলে সেটি কখন, কীভাবে এবং কার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় হারিয়েছে—তার একটি পৃথক প্রশাসনিক তদন্ত হওয়া উচিত।
ঘুষের অভিযোগ: প্রমাণের দাবি, তদন্তের প্রয়োজন
কাস্টমস বন্ডের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—ফাইল নিষ্পত্তি, অডিট, প্রাপ্যতা ও বিভিন্ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন।
ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, অডিটের সময় কোনো প্রতিষ্ঠানের দায় বা অনিয়মের সম্ভাবনা দেখিয়ে কর্মকর্তাদের একটি অংশ ‘দরকষাকষির’ সুযোগ তৈরি করেন। এরপর অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রমাণ ছাড়া কাউকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। বরং অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা যাচাই করতে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, অডিট নথি পরীক্ষা, সম্পদের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য।
প্রশ্ন হচ্ছে—বিগত কয়েক বছরের অডিট নথি ঝুঁকিভিত্তিকভাবে পুনঃনিরীক্ষা করা হলে কি অনিয়মের কোনো ধারাবাহিকতা পাওয়া যাবে?
‘প্রাপ্যতা’র নামে নতুন জটিলতা?
বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি সক্ষমতা ও পূর্ববর্তী কার্যক্রমের ভিত্তিতে প্রাপ্যতা নির্ধারণ করা হয়। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া এখন আগের তুলনায় বেশি জটিল।
কখনো রিভলভিং, কখনো কেস-টু-কেস এবং কখনো ব্যাংক গ্যারান্টির মতো বিভিন্ন পদ্ধতির কারণে ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন রপ্তানিকারকের যুক্তি, পূর্ববর্তী বছরের রপ্তানির পরিমাণ দিয়ে পরবর্তী বছরের কাঁচামালের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের নতুন বছরে হঠাৎ বড় অর্ডার আসতে পারে। বিদেশি ক্রেতা অতিরিক্ত কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনে অর্ডার কমেও যেতে পারে।
তাই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্যতা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
ডিজিটাল ব্যবস্থা কি সমস্যার সমাধান হতে পারে?
বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম যাচাইয়ের জন্য কাগজের ফাইলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার প্রয়োজন কমে এসেছে। একটি সমন্বিত ডাটাবেজে প্রতিষ্ঠানের আমদানি, রপ্তানি, কাঁচামাল, উৎপাদন ও ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।
বন্ড ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করার জন্য অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও রয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলেও এর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি।
বার্ষিক অডিট, প্রাপ্যতা, লাইসেন্স-সংক্রান্ত আবেদন ও অন্যান্য সেবা যদি অনলাইনে আবেদন, নথি আপলোড, স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদনের আওতায় আনা যায়, তাহলে কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষেরই যোগাযোগ কমবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির সুযোগও কমতে পারে।
তবে প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না; কে কখন কোন ফাইলে প্রবেশ করেছে, কী পরিবর্তন করেছে এবং কোন কর্মকর্তা অনুমোদন দিয়েছেন—এসবের ডিজিটাল অডিট ট্রেইলও নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রামে পোশাক কারখানা কমছে কেন?
একসময় চট্টগ্রামে ৭০০-এর বেশি তৈরি পোশাক কারখানা ছিল বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি। বর্তমানে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
এর পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং জটিলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমবাজারের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নীতি পরিবর্তনের মতো নানা কারণ রয়েছে।
তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, কাস্টমস বন্ডের প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতাও ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার অন্যতম কারণ।
অভিযোগটি যদি সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু একজন উদ্যোক্তার নয়; এটি দেশের রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বহিরাগত কম্পিউটার অপারেটরদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে কিছু বহিরাগত কম্পিউটার অপারেটর কাজ করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কেউ কেউ দাপ্তরিক নিয়োগ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম, ওয়েব পোর্টাল ও ডাটাবেজ ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে তাদের নিয়োগের বৈধতা, দায়িত্বের পরিধি এবং সংবেদনশীল সিস্টেমে প্রবেশাধিকার কীভাবে দেওয়া হয়েছে—তা প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে সরকারি ডাটাবেজের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড কার কাছে থাকে এবং কে কখন কোনো তথ্য পরিবর্তন বা অপসারণ করেছে—তার পূর্ণাঙ্গ লগ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ হোক, কিন্তু সৎ রপ্তানিকারক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল অনুমোদিত কাজে ব্যবহার না করে খোলা বাজারে বিক্রি করা হলে তা নিঃসন্দেহে গুরুতর অনিয়ম। এতে সরকার রাজস্ব হারায় এবং সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হন।
কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন হলো—যারা নিয়মিতভাবে এ ধরনের অনিয়ম করছে, তাদের শনাক্ত করতে আধুনিক তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে কি না।
খোলা বাজারে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় বা কাঁচামাল বিক্রির অভিযোগ থাকলে সরবরাহ চেইন, আমদানির তথ্য, গুদাম, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ—সবকিছু তথ্যভিত্তিকভাবে যাচাই করা সম্ভব।
অর্থাৎ, কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো রপ্তানিমুখী শিল্পকে সন্দেহের চোখে না দেখে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি প্রয়োজন।
বর্তমান কমিশনারের কাছে প্রত্যাশা
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের বর্তমান কমিশনার মোঃ জাকির হোসেন সম্পর্কে শিল্পসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ ব্যবসাবান্ধব ও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন বলে জানা গেছে। এর আগে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে একটি বড় দপ্তরের প্রধান হিসেবে তাঁর পক্ষে প্রতিটি ফাইলের প্রতিটি নথি নিজে যাচাই করা বাস্তবে সম্ভব নয়। ফলে তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম, ফাইল চলাচল, অডিট প্রক্রিয়া ও ডিজিটাল সিস্টেমের ব্যবহার আরও স্বচ্ছ করা জরুরি।
বিশেষ করে একই ধরনের ফাইল কোন পর্যায়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে, কোন কর্মকর্তা কতদিন ফাইল আটকে রাখছেন এবং কোনো প্রতিষ্ঠানকে কেন অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে—এসবের তথ্য প্রকাশযোগ্য পর্যায়ে আনা হলে জবাবদিহি বাড়বে।
দুদকের নজরদারি দরকার চাকরিরতদের ওপরও
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি—কোনো কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার পর সম্পদের তদন্তের পাশাপাশি চাকরিরত অবস্থায় দায়িত্ব পালনকালে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা দরকার।
কোনো কর্মকর্তা হঠাৎ বিপুল সম্পদের মালিক হলে শুধু তাঁর সম্পদ নয়, দায়িত্ব পালনকালে কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে কী ধরনের সুবিধা দিয়েছেন, কোন ফাইল কীভাবে নিষ্পত্তি করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর আর্থিক যোগাযোগ ছিল কি না—এসবও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
কারণ দুর্নীতি ধরা পড়ার পর তদন্তের চেয়ে দুর্নীতি হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের জন্য বেশি কার্যকর।
মূল প্রশ্ন: বন্ড কার জন্য?
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের জন্যই কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থার সৃষ্টি। বন্ডের উদ্দেশ্য রপ্তানি বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নিশ্চিত করা, সৎ ব্যবসায়ীদের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া এবং একই সঙ্গে রাজস্ব সুরক্ষা করা।
কিন্তু সেই ব্যবস্থাই যদি রপ্তানিকারকের ব্যবসা পরিচালনায় অতিরিক্ত বাধা সৃষ্টি করে, বিদেশি ক্রেতার আস্থা নষ্ট করে এবং সময়মতো রপ্তানি ব্যাহত করে, তাহলে নীতিগতভাবে বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
সরকারের উচিত একদিকে প্রকৃত বন্ড জালিয়াতি ও রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া, অন্যদিকে প্রকৃত রপ্তানিকারকদের জন্য হয়রানিমুক্ত, দ্রুত ও ডিজিটাল বন্ড ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
প্রয়োজনে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের গত কয়েক বছরের অডিট, লাইসেন্স, প্রাপ্যতা, প্রত্যয়নপত্র, আমদানি-রপ্তানি তথ্য এবং অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের ফরেনসিক অডিট করা যেতে পারে।
সেই সঙ্গে যেসব প্রত্যয়নপত্র সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর ডিজিটাল লগ, অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং প্রকাশের সময়কার রেকর্ড সংরক্ষণ করে যাচাই করা জরুরি।
কারণ একটি প্রশ্নের উত্তর এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—
কাস্টমস বন্ড কি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের জন্য, নাকি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকই কাস্টমস বন্ডের জন্য?
বাংলাদেশ যখন রপ্তানি বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার আয় শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, তখন রপ্তানিকারককে সহায়তা করার বদলে প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে দেওয়া হলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে দেশের রপ্তানি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
নোট: প্রতিবেদনে উল্লিখিত দুর্নীতি, ঘুষ, নথি অপসারণ ও অনিয়মসংক্রান্ত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য ও অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রাম এবং অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য, নথিপত্র ও প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্য যুক্ত করা সাংবাদিকতার দিক থেকে অপরিহার্য।

