চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল আমদানিকৃত ৯৪ কার্টন ক্রোকারিজ পণ্য। কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই উধাও হয়ে যায় চালানটির বড় একটি অংশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ লাখ টাকা মূল্যের এই পণ্য আত্মসাতের ঘটনায় তদন্তে উঠে এসেছে বন্দরকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ চক্রের নাম। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে চুরি যাওয়া ৫০ কার্টন পণ্য এবং জব্দ করা হয়েছে ব্যবহৃত যানবাহন।
ঘটনার প্রায় সাত দিন পর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় যমজ দুই ভাই নূরউদ্দিন ও মঈনউদ্দিনকে চক্রটির মূলহোতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। মঈনউদ্দিনকে পটিয়ার বাকখাইন থেকে গ্রেপ্তার করা হলেও নূরউদ্দিন এখনো পুলিশের নাগালের বাইরে বলে জানানো হয়েছে।
৯৪ কার্টন পণ্য, গন্তব্যে পৌঁছাল মাত্র ৪৪?
পুলিশ ও মামলার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ মে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ৬ মে রাত দেড়টার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৯৪ কার্টন আমদানিকৃত ক্রোকারিজ পণ্য ঢাকার উদ্দেশে নেওয়া হয়। অভিযোগ, নির্ধারিত মালিকের কাছে পণ্য পৌঁছে না দিয়ে কৌশলে চালানটি সরিয়ে ফেলা হয়। পরে তদন্তে চুরি যাওয়া পণ্যের ৫০ কার্টন উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় বন্দর থানায় মামলা হওয়ার পর তদন্তে নামে ডিবির একটি বিশেষ দল। অভিযানে প্রথমে কাভার্ডভ্যান চালক নীরব চৌধুরী ওরফে সাকিবকে এবং পরে তার সহযোগী মো. সাখাওয়াত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই চক্রটির বিস্তৃত নেটওয়ার্কের বিষয়ে অনুসন্ধান এগোয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হেলপার থেকে ‘পণ্য চুরির ব্যবসা’
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, নূরউদ্দিন ও মঈনউদ্দিনের উত্থানের গল্পটিও চক্রটির কর্মকাণ্ডের মতোই চাঞ্চল্যকর। প্রায় ছয় বছর আগে পটিয়ার বাকখাইন গ্রামের বাড়ি থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে আসেন দুই ভাই। শুরুতে গাড়ির হেলপার হিসেবে কাজ করতেন তারা।
পরবর্তীতে পরিচয় হয় পণ্য চুরি চক্রের সদস্য হিসেবে পরিচিত ‘মনা’র সঙ্গে। এরপর ধীরে ধীরে বন্দর থেকে বের হওয়া পণ্য আত্মসাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন দুই ভাই—এমন তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় বছর আগেও চোরাই পণ্যসহ গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন তারা। কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে আবারও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
ছয় বছরে বদলে গেল জীবনযাত্রা
তদন্তে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে দুই ভাইয়ের দ্রুত সম্পদ বৃদ্ধিকে ঘিরে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একসময় গাড়ির হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা দুই ভাইয়ের এখন রয়েছে একাধিক কাভার্ডভ্যান ও দামি যানবাহন।
ক্রোকারিজ পণ্য চুরির ঘটনায় ব্যবহৃত কাভার্ডভ্যানটি নূরউদ্দিনের বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া চলাচলের জন্য তারা একটি SUV ব্যবহার করতেন। এর আগে একটি নিশান এক্স-ট্রেইল গাড়ি ব্যবহারের তথ্যও তদন্তে এসেছে। রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের ইয়ামাহা R15 মোটরসাইকেল।
শুধু নগরীতে নয়, গ্রামের বাড়িতেও সম্পদের ছাপ দেখা গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পটিয়ার বাকখাইনে সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন তারা। পুলিশের দাবি, ভবনটির মূল্য কোটি টাকার কাছাকাছি।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস কী—পণ্য পরিবহন ব্যবসা, নাকি দীর্ঘদিনের অবৈধ কর্মকাণ্ড—তা এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কদমতলীতে ট্রান্সপোর্ট অফিস
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, নগরীর কদমতলী ডিটি রোডে দুই ভাইয়ের একটি ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের অফিস রয়েছে। পুলিশের সন্দেহ, বৈধ পরিবহন ব্যবসার আড়ালে বন্দর থেকে বের হওয়া পণ্যের গতিপথ, চালক ও কাভার্ডভ্যান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত চালক, হেলপার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে কোন চালানে কী পণ্য রয়েছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কোন গাড়িতে তা পরিবহন করা হচ্ছে—এসব তথ্য চক্রের হাতে পৌঁছাত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে চক্রটি?
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের চুরিতে শুধু একজন চালক বা পরিবহনকর্মী জড়িত থাকলেই পুরো চালান গায়েব করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন হয় চালান, গাড়ি, চালক, গন্তব্য এবং পণ্যের তথ্য সম্পর্কে সমন্বিত ধারণা।
এ কারণে সাম্প্রতিক ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির আরও সদস্য, পণ্য সরানোর স্থান, ক্রেতা এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ।
পুলিশের হাতে উদ্ধার হওয়া ৫০ কার্টন পণ্যও এখন গুরুত্বপূর্ণ আলামত। এসব পণ্য কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল, কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং বাকি পণ্য কোথায় গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
‘চুরি নয়, ব্যবসা’—পুলিশের ভাষ্য
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নূরউদ্দিন ও মঈনউদ্দিনের কাছে বন্দর থেকে পণ্য চুরি করাটা যেন একটি নিয়মিত পেশা বা ব্যবসায় পরিণত হয়েছিল। ক্রোকারিজ পণ্য চুরির ঘটনায় দুই ভাইকেই মূলহোতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এর আগে নীরব চৌধুরী ওরফে সাকিব, সাখাওয়াত হোসেন ও আশিক রায়হানসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঈনউদ্দিনকে পটিয়ার বাকখাইন থেকে গ্রেপ্তার করা হলেও নূরউদ্দিন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
প্রশ্ন এখন আরও বড়
একটি চালান থেকে ৪০ লাখ টাকার পণ্য কীভাবে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই উধাও হলো—এ প্রশ্নের পাশাপাশি তদন্তে এখন সামনে এসেছে আরও বড় কয়েকটি প্রশ্ন।
বন্দর থেকে বের হওয়ার আগেই কি পণ্যের তথ্য পাচার হতো? পরিবহন পর্যায়ে কারা সহযোগিতা করত? চুরি করা পণ্য কোথায় বিক্রি করা হতো? ক্রেতাদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখত? আর কয়েক বছরের মধ্যে হেলপার থেকে কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার পেছনে আর কী কী ব্যবসা বা আয়ের উৎস ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা গেলে শুধু একটি চালান চুরির রহস্য নয়, চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য লোপাটের আরও বড় নেটওয়ার্কের চিত্রও সামনে আসতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জব্দ করা যানবাহন-পণ্যসহ অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে চক্রটির সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং চুরি হওয়া পণ্য কোথায় বিক্রি করা হতো—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তাধীন; আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না।

