ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

আর.টি. ফ্যাশনের

কাগজে রপ্তানি, ডিপোতে পণ্যই নেই! কাস্টমসের সিল-স্বাক্ষর জাল করে বন্ড পণ্যে ভয়ংকর জালিয়াতি

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

কাগজে রপ্তানি, ডিপোতে পণ্যই নেই! কাস্টমসের সিল-স্বাক্ষর জাল করে বন্ড পণ্যে ভয়ংকর জালিয়াতি

ছবিঃ সংগৃহীত

বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পোশাক তৈরির কাঁচামাল রপ্তানির নামে কাগজে-কলমে বিল অব এক্সপোর্ট (বি/ই) দেখিয়ে বাস্তবে তা দেশীয় খোলা বাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত সামিট এলায়েন্স পোর্ট লিমিটেড অফডককে কেন্দ্র করে কাস্টমস কর্মকর্তা ও ডিপো ইনচার্জের সিল-স্বাক্ষর জাল এবং কাস্টমসের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ভুয়া তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘আর.টি. ফ্যাশন’ এবং তাদের সিএন্ডএফ এজেন্ট ‘মেসার্স শাহজালাল এন্টারপ্রাইজ’। সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগ অনুযায়ী, বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা লেডিস পোশাকের কাঁচামাল নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানির কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও কয়েকটি চালানের ক্ষেত্রে কাগজে রপ্তানি সম্পন্ন দেখানোর চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি তদন্তে উঠে আসার পর এ ঘটনায় ফৌজদারি মামলা হয়েছে।

সন্দেহ থেকেই বেরিয়ে আসে জালিয়াতির তথ্য

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৪ মে। একটি পণ্য চালানের শুল্কায়নের সময় রাজস্ব কর্মকর্তা নাজমা সুলতানার সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও ডিপো রেকর্ড যাচাই শুরু করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিল অব এক্সপোর্টে সামিট এলায়েন্স পোর্ট লিমিটেড অফডকে বিপুল পরিমাণ পণ্য গ্রহণ ও রপ্তানির তথ্য উল্লেখ ছিল। কিন্তু ডিপোর নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, ওই চালানের বিপরীতে কোনো টার্মিনাল রিসিট (TR) ইস্যু করা হয়নি।

পরে ডিপো কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে জানায়, সংশ্লিষ্ট বিল অব এক্সপোর্টে যে পরিমাণ কার্টন ও পোশাকের চালান দেখানো হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি বাস্তবে ওই ডিপোতে গ্রহণ করা হয়নি।

ফলে তদন্তকারীদের কাছে প্রশ্ন দেখা দেয়—ডিপোতে পণ্যই না গেলে কীভাবে ওই চালানের বিপরীতে রপ্তানির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো?

চারটি বিল অব এক্সপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগে বলা হয়েছে, আর.টি. ফ্যাশনের বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খালাস ও রপ্তানি সম্পন্ন দেখানোর জন্য চারটি বিল অব এক্সপোর্ট তৈরি করা হয়। এসব নথির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিল ও স্বাক্ষর যাচাই করা হলে সেগুলো নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তানজিনা জান্নাত আইভি এবং সংশ্লিষ্ট ডিপো ইনচার্জের সিল-স্বাক্ষর নকল করে নথিপত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জাল সিল তৈরির ক্ষেত্রে কালি, ডটের সংখ্যা, বানান ও অন্যান্য সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যেও কারসাজি করা হয়, যাতে সেগুলো আসল বলে মনে হয়।

কাস্টমসের সিস্টেমেও ভুয়া তথ্য দেওয়ার অভিযোগ

শুধু কাগজপত্র জালিয়াতির মধ্যেই ঘটনাটি সীমাবদ্ধ ছিল না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কাস্টমসের সরবরাহ করা ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সিএন্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সিস্টেমে ভুয়া তথ্য সাবমিট করে বিল অব এক্সপোর্ট নম্বর তৈরি করা হয়েছে—এমন অভিযোগও তদন্তে এসেছে।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, কাস্টমসের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড কার মাধ্যমে, কীভাবে এবং কোন অনুমোদনে ব্যবহার করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সিস্টেমে তথ্য প্রবেশের সময়, আইপি অ্যাড্রেস, ব্যবহারকারীর লগ ও সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল রেকর্ড যাচাই করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নিজের সিল-স্বাক্ষর জাল, মামলা করলেন কর্মকর্তা

নিজের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তানজিনা জান্নাত আইভি বাদী হয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন।

মামলায় দণ্ডবিধির ৪১৭, ৪৬৭সহ একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, নথি তৈরির প্রক্রিয়া এবং জালিয়াতির সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসার কথা।

তবে মামলা হওয়া বা অভিযোগ ওঠা মানেই অভিযুক্তদের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।

বন্ড সুবিধার আড়ালে রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা

কাস্টমস সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল নির্ধারিত নিয়মে রপ্তানিমুখী পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করার কথা। এসব কাঁচামাল যদি রপ্তানির বদলে স্থানীয় বাজারে চলে যায় এবং কাগজে-কলমে রপ্তানি দেখানো হয়, তাহলে একদিকে সরকারের প্রাপ্য শুল্ক-কর আদায় ব্যাহত হয়, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসায়ীরাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, শুধু আলোচিত চারটি বিল অব এক্সপোর্টের তদন্ত করলেই হবে না; আর.টি. ফ্যাশনের পূর্ববর্তী বন্ড চালান, আমদানি-রপ্তানি নথি, ইউডি (Utilization Declaration), টার্মিনাল রিসিট, বিল অব এন্ট্রি, বিল অব এক্সপোর্ট এবং কাস্টমস সিস্টেমের ডিজিটাল লগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

তাহলে এর আগে একই কৌশলে কোনো চালান রপ্তানি দেখানো হয়েছিল কি না এবং এতে সরকারের কী পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেটিও বেরিয়ে আসতে পারে।

ফোন নম্বর নিয়ে পাল্টা দাবি

এদিকে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিজিএমইএর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মেম্বার আইডি ৬৬০২-এর তথ্য অনুযায়ী আর.টি. ফ্যাশনের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

যোগাযোগের সময় তিনি দাবি করেন, ব্যবহৃত নম্বরটি কোনো পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নম্বর নয়; বরং এটি ডিজিএফআইয়ের (DGFI) নম্বর এবং কেউ শত্রুতাবশত নথিতে তার নম্বর যুক্ত করেছে।

তবে বিজিএমইএর সদস্য ডাটাবেজে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ওই যোগাযোগ নম্বর কীভাবে এসেছে—এ প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য, বিজিএমইএর সদস্যপদ সংক্রান্ত তথ্য এবং সরকারি নথিপত্র পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে বড় চক্রের তথ্য

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এটি যদি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা না হয়ে থাকে, তাহলে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল অপব্যবহার, ভুয়া রপ্তানি নথি তৈরি, জাল সিল-স্বাক্ষর এবং কাস্টমসের ডিজিটাল ব্যবস্থায় অননুমোদিত তথ্য প্রবেশের সঙ্গে আরও বড় কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে।

তাই মামলার পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত, ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজ, টিআর ইস্যু রেজিস্টার, কাস্টমস সিস্টেমের লগ, সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের নথি এবং আর.টি. ফ্যাশনের পূর্ববর্তী বন্ড চালান খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

এখন তদন্তেই নির্ধারিত হবে—কাগজে দেখানো রপ্তানি আদৌ হয়েছিল কি না, বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামালের প্রকৃত গন্তব্য কোথায় এবং এই প্রক্রিয়ায় সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কত।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!