ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

বেনাপোলে ৬ কোটি টাকার জব্দ পণ্য উধাও, অভিযোগের কেন্দ্রে এআরও মাহিদুল সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

বেনাপোলে ৬ কোটি টাকার জব্দ পণ্য উধাও, অভিযোগের কেন্দ্রে এআরও মাহিদুল সিন্ডিকেট

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের জব্দকৃত উচ্চ শুল্কযুক্ত ভারতীয় পণ্য রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনায় কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়ী মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কাস্টমসের কঠোর নিরাপত্তায় থাকা তালাবদ্ধ ৩৭ নম্বর শেড থেকে মূল্যবান আমদানিকৃত পণ্য সরিয়ে সেখানে নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি ও থ্রিপিস রেখে পুরো চালানটি বদলে ফেলা হয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঘটনার তদন্তে মামলা দায়ের করা হলেও অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মাহিদুল ইসলামকে আসামি করা হয়নি। এ নিয়ে বন্দরজুড়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ায় তিনি আইনের আওতার বাইরে থেকে গেছেন।

এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে জব্দ হয়েছিল চালান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর তথ্যের ভিত্তিতে গত ১২ মার্চ শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে একটি উচ্চমূল্যের ভারতীয় পণ্যের চালান জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। পণ্যটি যাতে কোনোভাবেই হাতবদল বা পরিবর্তন না হয়, সে জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল এবং ২০ মে—এই তিন দফায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে পৃথক চিঠি দিয়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়, জব্দ চালান যেন কোনোভাবেই স্থানান্তর, খোলা বা পরিবর্তন করা না হয়।কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, কোরবানির ঈদের ছুটির সুযোগে তালাবদ্ধ শেডের ভেতর থেকেই রহস্যজনকভাবে পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়।

কায়িক পরীক্ষায় ধরা পড়ে ভয়ংকর জালিয়াতি। ঈদের ছুটি শেষে ২ জুন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা চালানটির কায়িক পরীক্ষা (Physical Examination) করতে গিয়ে বিস্মিত হন।

পরীক্ষায় দেখা যায়, জব্দ তালিকায় থাকা উচ্চ শুল্কযুক্ত বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে সেখানে রাখা হয়েছে নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি, থ্রিপিস ও কমমূল্যের কাপড়।

অর্থাৎ পুরো চালানটি পরিকল্পিতভাবে বদলে ফেলা হয়েছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, এত বড় ধরনের পণ্য অদলবদল কোনোভাবেই এককভাবে সম্ভব নয়। এর পেছনে বন্দরের অভ্যন্তরে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারী, গুদাম ব্যবস্থাপনা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

মামলা হলেও বাদ গেলেন অভিযোগের কেন্দ্রের কর্মকর্তা ঘটনার পর ৯ জুন কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, যাকে পুরো ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, সেই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলামকে মামলায় আসামি করা হয়নি।

এ ঘটনায় বন্দরের ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের প্রশ্ন—যদি শেড ইনচার্জ, ব্যবসায়ী ও এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, তাহলে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা একজন কাস্টমস কর্মকর্তা কীভাবে মামলার বাইরে থাকেন? ‘শুল্ক ফাঁকি সিন্ডিকেটের’ নেতৃত্বে মাহিদুল?

বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই বেনাপোল কাস্টমসকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ শুল্ক ফাঁকি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম নেতৃত্বে রয়েছেন এআরও মাহিদুল ইসলাম।
তার সঙ্গে বগুড়ার কয়েকজন ব্যবসায়ী ও দালাল চক্রের সদস্য—হিরু,আজিম,সামাদ,ডাবু,রুহুল কুদ্দুস ওরফে আনোয়ার,মনির,সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইনুল ইসলাম-১,
বন্দরের আশিকুর রহমান রনি

—নিয়মিতভাবে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ওজনে কারচুপি, জাল নথিপত্র তৈরি, পণ্য ঘোষণায় ভুয়া তথ্য প্রদান এবং অবৈধভাবে শুল্ক কমিয়ে পণ্য খালাসের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে চালান বদলের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, রিয়াদ এজেন্সির কর্মচারী রুহুল কুদ্দুস ওরফে আনোয়ারের মাধ্যমে প্রায় ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে পুরো চালান অদলবদলের ঘটনা সমন্বয় করা হয়।

যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজ, গেট পাস, গুদামের প্রবেশ-নথি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

যা বললেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগের বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলাম বলেন,

"আমি কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নই। তবে ৩৭ নম্বর শেডের ঘটনায় আশিকুর রহমান রনিকে সহযোগিতা করেছি। সে আমার পরিচিত হওয়ায় সহযোগিতা করেছিলাম।"

তার এই বক্তব্য নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সহযোগিতা করার বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজস্বে হাজার কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি চালান গায়েব হওয়ার ঘটনা নয়; বরং বেনাপোল বন্দরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা শুল্ক ফাঁকি, পণ্য পাচার, জাল নথিপত্র এবং রাজস্ব লুটপাটের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের একটি বড় উদাহরণ।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, গত অর্থবছরে এই ধরনের অনিয়ম ও শুল্ক ফাঁকির কারণে বেনাপোল কাস্টমসে প্রায় ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের অনিয়ম শুধু সরকারের রাজস্ব আদায়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং বৈধ আমদানিকারকদের প্রতিযোগিতায়ও বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের কাস্টমস ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বেনাপোল বন্দরের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে কাস্টমসের হেফাজতে থাকা জব্দকৃত কোটি টাকার পণ্য গায়েব হয়ে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তাদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যে-ই হোন না কেন, প্রভাবশালী কর্মকর্তা বা সিন্ডিকেটের সদস্যদেরও আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বন্দরকেন্দ্রিক দুর্নীতি ও শুল্ক ফাঁকির চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতি অব্যাহত থাকবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

দুর্নীতি থেকে আরও পড়ুন

banner
Link copied!