ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

কনটেইনারেই নষ্ট কয়েক হাজার কোটি টাকার পণ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম

কনটেইনারেই নষ্ট কয়েক হাজার কোটি টাকার পণ্য

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নিলামযোগ্য কনটেইনারের জট এখন বড় ধরনের লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল ও ইয়ার্ডে প্রায় ৯ হাজার ২৭৮টি পণ্যবোঝাই কনটেইনার বছরের পর বছর পড়ে রয়েছে। এসব কনটেইনারে থাকা প্রায় দুই লাখ টন আমদানিকৃত পণ্যের বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বন্দর ও কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস না হওয়ায় এগুলো নিলামে বিক্রি বা ধ্বংস করার কথা থাকলেও প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে বহু কনটেইনার বন্দরে আটকে রয়েছে। এতে একদিকে মূল্যবান পণ্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বন্দরের ধারণক্ষমতা কমে গিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

চট্টগ্রাম বন্দর আইন অনুযায়ী, জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক পণ্য গ্রহণ না করলে তা কাস্টমসের মাধ্যমে নিলামে বিক্রি অথবা প্রয়োজন হলে ধ্বংস করার বিধান রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে বছরের পর বছর ধরে এসব কনটেইনার বন্দরের ইয়ার্ড ও শেডে পড়ে রয়েছে। ফলে নিলামযোগ্য কনটেইনারগুলোই বর্তমানে বন্দরের মোট জায়গার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ দখল করে রেখেছে।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই জায়গা খালি করা গেলে নতুন আমদানি ও রপ্তানি পণ্য দ্রুত হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে এবং বন্দরের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার পণ্য

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নিলামের অপেক্ষায় থাকা ৯ হাজার ২৭৮টি কনটেইনারের মধ্যে ২ হাজার ৭০০টি ২০ ফুট এবং ৬ হাজার ৫৭৮টি ৪০ ফুট কনটেইনার রয়েছে।

এসবের মধ্যে অনেক কনটেইনার ১০ থেকে ১৫ বছর আগে বন্দরে এলেও এখনও নিলাম সম্পন্ন হয়নি। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় কমলা, মাল্টা, খেজুর, আদা, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পচনশীল পণ্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। পাশাপাশি কনটেইনারগুলোরও ব্যবহারযোগ্যতা হারিয়ে যাচ্ছে।

কেন খালাস নেয়নি আমদানিকারকরা?

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন কারণে এসব পণ্য বন্দরে পড়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে—

বাজারমূল্য কমে যাওয়া;
প্রয়োজনীয় আমদানি নথিপত্রের ঘাটতি;
শুল্ক সংক্রান্ত বিরোধ;
ব্যাংকিং জটিলতা;
আইনি বিরোধ এবং
ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কায় পণ্য পরিত্যাগ।

ফলে অনেক আমদানিকারক কনটেইনার খালাস না নিয়ে তা বন্দরে ফেলে রেখেছেন।

ধীরগতির নিলামে বাড়ছে সংকট

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস প্রতি মাসে মাত্র ২০ থেকে ৩০টি কনটেইনার উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করছে। কিছু কনটেইনার ই-অকশনের মাধ্যমেও বিক্রি হলেও বিপুল সংখ্যক কনটেইনারের তুলনায় এ গতি অত্যন্ত ধীর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ হাজার ৬৯৭টি কনটেইনার নিলামের জন্য তালিকাভুক্ত হলেও অনুমোদন মিলেছে মাত্র ১ হাজার ৬১৯টির।

গত বছর ৪৯৩টি এবং চলতি বছরে ৪৯৫টি কনটেইনার নিলাম শেষে হস্তান্তর করা হয়েছে। অর্থাৎ দেড় বছরে মোট ৯৮৮টি কনটেইনার নিষ্পত্তি হলেও একই সময়ে নতুন করে আরও কয়েকশ কনটেইনার নিলামের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ফলে জট কমার বদলে সংকট স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (মেরিন অ্যান্ড হারবার) কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, বর্তমানে বন্দরের সক্ষমতার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জায়গা নিলামযোগ্য কনটেইনার দখল করে আছে।

তিনি বলেন, "এসব কনটেইনার দ্রুত সরানো গেলে বন্দরে নতুন করে বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য সংরক্ষণ ও হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে বন্দরের কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।"

কাস্টমসের ব্যাখ্যা

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, নিলাম কার্যক্রম সম্পূর্ণ বিধি অনুসরণ করে পরিচালনা করতে হয়।

তার ভাষ্য, "প্রক্রিয়াগত কিছু ধাপ থাকায় সময় লাগছে। তবে নিলাম কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং এটিকে আরও গতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।"

শিপিং খাতের ক্ষোভ

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে শুধু পণ্যই নষ্ট হচ্ছে না, কনটেইনারগুলোরও কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, "বছরের পর বছর কনটেইনার বন্দরে পড়ে থাকায় শিপিং এজেন্টদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। আমরা বহুবার চিঠি দিয়ে এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারে দ্রুত নিলাম সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছি।"

বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, নিলাম প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন, দ্রুত অনুমোদন, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ আরও বাড়বে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি, জাহাজজট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!