দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনস্কেল বা ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। নতুন আদেশ অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতনের একটি অংশ কার্যকর হবে। এরপর ধাপে ধাপে বর্ধিত বেতনের অংশ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টসহ শতভাগ নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে।
একইভাবে সরকারি পেনশনভোগীদেরও ধাপে ধাপে বর্ধিত নিট পেনশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পর্যায়ক্রমে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত এবং আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপন জারি ১৭ সেপ্টেম্বর
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন-১ অনুবিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে নতুন বেতনস্কেল কার্যকরের পাশাপাশি বেতন নির্ধারণ, পর্যায়ক্রমে বর্ধিত বেতন প্রদান, পেনশন পুনর্নির্ধারণ এবং বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে বাড়তি বেতনের ৪০ ও ৫০ শতাংশ
নতুন আদেশ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতনস্কেল অনুসারে সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ করা হবে। তবে বেতন বৃদ্ধির পুরো অঙ্ক একবারে কার্যকর না করে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।
চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত—
৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধির মোট অঙ্কের ৪০ শতাংশ পাবেন।
১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধির মোট অঙ্কের ৫০ শতাংশ পাবেন।
অর্থাৎ নতুন বেতনস্কেলে নির্ধারিত বেতন ও আগের বেতনের পার্থক্যের পুরোটা প্রথম ধাপেই পাওয়া যাবে না; নির্ধারিত হারে বর্ধিত অংশ মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে বাড়বে বর্ধিত অংশ
দ্বিতীয় ধাপে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত নতুন বেতনস্কেলের বর্ধিত অংশ আরও বাড়ানো হবে।
এ সময়ে—
৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব: বেতন বৃদ্ধির মোট অঙ্কের ৭০ শতাংশ;
১০ম থেকে ২০তম গ্রেড: বেতন বৃদ্ধির মোট অঙ্কের ৭৫ শতাংশ
কার্যকর হবে।
এরপর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে নতুন বেতনস্কেলের পুরো বর্ধিত বেতন, অর্থাৎ বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টসহ শতভাগ মূল বেতন কার্যকর হবে।
বকেয়া বেতনও পাবেন কর্মচারীরা
প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ পর্যন্ত সময়ের বর্ধিত বেতন বকেয়া হিসেবে পরিশোধ করা হবে।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং প্রজ্ঞাপন জারির মধ্যবর্তী সময়ের প্রাপ্য বর্ধিত বেতন কর্মচারীদের পাওনা হিসেবে গণ্য হবে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে বৃদ্ধি
সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও নতুন আদেশের আওতায় পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিদ্যমান নিট পেনশন অনুযায়ী দুটি স্ল্যাবে বর্ধিত পেনশন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে—
২০ হাজার ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন বৃদ্ধির মোট অঙ্কের ৪০ শতাংশ;
১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির মোট অঙ্কের ৫০ শতাংশ
বিদ্যমান নিট পেনশনের সঙ্গে যোগ করে দেওয়া হবে।
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পেনশন আরও বাড়বে
দ্বিতীয় ধাপে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত পেনশনভোগীদের বর্ধিত নিট পেনশনের অংশ আরও বাড়বে।
এ সময়ে—
২০ হাজার ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব নিট পেনশন: বৃদ্ধির মোট অঙ্কের ৭০ শতাংশ;
১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন: বৃদ্ধির মোট অঙ্কের ৭৫ শতাংশ
কার্যকর হবে।
এরপর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে বার্ষিক বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টসহ নিট পেনশন শতভাগ কার্যকর হবে।
অবসরপ্রাপ্ত ও পারিবারিক পেনশনভোগীরাও পাবেন বকেয়া
নতুন আদেশে অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের বকেয়া পাওনার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
তারা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ পর্যন্ত সময়ের বর্ধিত নিট পেনশন বকেয়া হিসেবে পাবেন।
ফলে নতুন পে-স্কেলের আওতায় শুধু বর্তমানে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, অবসরপ্রাপ্ত এবং আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরাও আর্থিক সুবিধার আওতায় আসছেন।
অবসরে গেলেও নতুন স্কেল অনুযায়ী পেনশন
এ ছাড়া ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭-এর মধ্যে কোনো সরকারি কর্মচারী অবসর-উত্তর ছুটি (পিআরএল) শেষে অবসরে গেলে তার গ্রস ও নিট পেনশন ‘জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬’ অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
অর্থাৎ নতুন বেতনস্কেল কার্যকরের সময়সীমার মধ্যে অবসরে যাওয়া কর্মচারীদের পেনশন নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নতুন বেতন আদেশ প্রযোজ্য হবে।
দুই ধাপে বাস্তবায়ন, পূর্ণ সুবিধা ২০২৭ সালের জুলাই থেকে
নতুন পে-স্কেলের কাঠামো অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুবিধা একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে নির্দিষ্ট হারে বর্ধিত বেতন, দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে আরও বেশি অংশ এবং শেষ ধাপে ২০২৭ সালের জুলাই থেকে ইনক্রিমেন্টসহ শতভাগ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে।
একই কাঠামো অনুসরণ করে পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। ফলে নতুন বেতন আদেশের আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৬, ১ জানুয়ারি ২০২৭ এবং ১ জুলাই ২০২৭—এই তিনটি তারিখ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

