ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। নতুন এই কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট বা ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ধারাবাহিকতায় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের নতুন এই কূপকে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন করে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর খাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা বাড়তি জোগান তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
৩ হাজার ৫২৬ মিটার গভীরে খনন
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপটির খননকাজ শুরু হয় গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর এলাকায় কূপটির খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
খননকাজ শেষে কূপটি প্রায় ৩ হাজার ৫২৬ মিটার গভীর পর্যন্ত নেওয়া হয়। এরপর কূপে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষার পর কূপটি থেকে গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা নিশ্চিত হলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ জুন থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ২৮ নম্বর কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। কয়েক মাসের পরীক্ষামূলক সরবরাহ ও কারিগরি কার্যক্রম শেষে শনিবার এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হলো।
প্রতিদিন ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস
নতুন কূপটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই পরিমাণ সরবরাহকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দেশে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি থাকায় বিভিন্ন সময়ে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। এ অবস্থায় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে নতুন উৎপাদন যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ থেকে পাওয়া নতুন গ্যাস সেই সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে স্থানীয় উৎসের গ্যাসের পরিমাণ আরও বাড়বে।
তিতাসে উৎপাদনরত ২৩টি কূপ
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র তিতাসে বর্তমানে ২৩টি কূপ উৎপাদনে রয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
নতুন ২৮ নম্বর কূপ যুক্ত হওয়ায় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিমাণ আরও বাড়ল। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনে তিতাসের অবদান আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দেশীয় উৎস হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে পুরোনো কূপের উৎপাদন কমে গেলেও নতুন কূপ খননের মাধ্যমে উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ
দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার এবং গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাব্য মজুত অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিতাসের ২৮ নম্বর কূপের উৎপাদন শুরু সেই ধারাবাহিকতার অংশ। নতুন কূপ থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় দেশীয় উৎসের সরবরাহ বাড়বে এবং একই সঙ্গে বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত জোগান তৈরি হবে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে কী প্রভাব পড়বে
গ্যাস বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের অন্যতম প্রধান জ্বালানি। ফলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত গ্যাস যুক্ত হলে গ্যাসনির্ভর খাতগুলোতে সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে নতুন কূপ থেকে পাওয়া গ্যাস কোন কোন খাতে কী পরিমাণে সরবরাহ করা হবে এবং এর ফলে সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিতরণ পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে।
উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক সরবরাহের আনুষ্ঠানিকতা
গত ১৯ জুন পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও শনিবারের উদ্বোধনের মাধ্যমে কূপটির উৎপাদন ও গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
কূপটি খনন থেকে শুরু করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা কাজ করেছেন।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনশীল কূপের সঙ্গে নতুন ২৮ নম্বর কূপ যুক্ত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনে আরও একটি উৎস যোগ হলো। প্রতিদিন ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি জোগান দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টাতেও এটি ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

