ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট সামরিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় আবারও কড়াকড়ি আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত মার্চে চালু করা ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রাথমিক পর্যায়ে মোটরসাইকেলচালকদের জন্য এই পদ্ধতি কার্যকর করা হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য যানবাহন ও খাতে এর আওতা সম্প্রসারণ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল তেল বিতরণের একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; বরং বাজারে কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত মজুত, কালোবাজারি ও অপ্রয়োজনীয় চাহিদা নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় সরকার আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নিয়েছে।
মার্চের সংকট, প্যানিক বায়িং ও মজুতের চাপ
গত মার্চে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। একই সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেক গ্রাহক প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তেল কিনতে শুরু করেন। অর্থনীতির ভাষায় একে ‘প্যানিক বায়িং’ বলা হয়।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি মজুতাগার থেকে দ্রুত তেল সরবরাহ করতে হলেও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সংরক্ষিত মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তেল মজুত ও কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করে বলে অভিযোগ ওঠে।
বাজারে শৃঙ্খলা আনতে চালু হয়েছিল ফুয়েল পাস
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার গত এপ্রিল থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ধাপে ধাপে ফুয়েল পাস বা ফুয়েল কার্ড ব্যবস্থা চালু করে। নির্ধারিত পাম্প থেকে নির্দিষ্ট নিয়মে তেল সংগ্রহের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্রয় নিয়ন্ত্রণ, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং কালোবাজারি প্রতিরোধই ছিল এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়। ফলে অতিরিক্ত চাহিদা কমে আসে এবং বাজার ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করে। পরবর্তীতে মে মাস থেকে ফুয়েল পাস ব্যবস্থার প্রয়োগ শিথিল করা হয়।
আবারও সক্রিয় হচ্ছে ফুয়েল পাস
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপিসি আবারও ফুয়েল পাস কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বণ্টন ও বিপণন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ফেরদৌসী মাসুম হিমেল বলেন,
“ফুয়েল পাস আগে থেকেই কার্যকর ছিল। আমরা এটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করিনি। জ্বালানি সংকট কমে যাওয়ায় এর ব্যবহার অনেকটাই শিথিল হয়েছিল। এখন আবার এটি সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান,
“যেসব ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেখান থেকে পাস প্রদর্শন করেই জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে মোটরসাইকেলচালকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।”
শতাধিক পাম্পে ছিল ফুয়েল পাস ব্যবস্থা
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার শতাধিক ফিলিং স্টেশনে ইতোমধ্যেই ফুয়েল পাস ব্যবস্থা চালু রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এর ব্যবহার কমে গিয়েছিল, তবে সংশ্লিষ্ট পাম্পগুলোতে এখনো ফুয়েল পাস সংক্রান্ত নির্দেশনা ও ব্যানার টানানো রয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব স্টেশনে আবারও নিয়মিতভাবে ফুয়েল পাস যাচাইয়ের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
কেন আবার এই উদ্যোগ?
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি যেকোনো সময় নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। এমন অবস্থায় সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, সরকারি মজুত সংরক্ষণ এবং অযৌক্তিক চাহিদা প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা হিসেবে ফুয়েল পাসকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত ও তথ্যভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ফুয়েল কার্ড বা ফুয়েল পাস দীর্ঘমেয়াদেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ব্যবস্থা যেন সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তির কারণ না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
পরিস্থিতির ওপর নজর সরকারের
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, আমদানি পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ফুয়েল পাস ব্যবস্থার আওতা আরও বাড়ানো হতে পারে। তবে বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনার কোনো প্রয়োজন নেই বলেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

