দেশের জ্বালানি খাতে বাড়তে থাকা আমদানি ব্যয়, ভর্তুকির চাপ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে আসার প্রেক্ষাপটে আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ১৬ টাকা থেকে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি গ্যাসের দাম ৪৩ টাকা থেকে প্রায় ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবটি বর্তমানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অনুমোদনের পর তা পেট্রোবাংলায় ফেরত পাঠানো হবে। এরপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠানো হলে গণশুনানি ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভর্তুকির চাপ কমাতেই মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সংস্থাটি বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। বর্তমানে গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য প্রতি ঘনমিটার ৩১.৬৫ টাকা, অথচ গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকা। ফলে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৮.০২ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৭৯ টাকা, যেখানে বিক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত থাকায় প্রতি ঘনমিটারে ২১.৮২ টাকা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আর্থিক ঘাটতি প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম: ১৬ টাকা থেকে ২৫ টাকা
সিএনজি (যানবাহন): ৪৩ টাকা থেকে প্রায় ৬৫ টাকা প্রতি ঘনমিটার
তবে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এই পর্যায়ে আবাসিক, বাণিজ্যিক বা অন্যান্য গ্রাহকের গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই।
বিতরণ কোম্পানিগুলোরও চার্জ বাড়ানোর আবেদন
গ্যাসের মূল্যের পাশাপাশি বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানিও তাদের বিতরণ চার্জ (ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ) বাড়ানোর আবেদন করেছে।
কর্ণফুলী গ্যাস: ৩৭ পয়সা থেকে ১.২১ টাকা
পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস: ২৪ পয়সা থেকে ৪১ পয়সা
বাখরাবাদ গ্যাস: ৩০ পয়সা থেকে ৯০ পয়সা
জালালাবাদ গ্যাস: ১৮ পয়সা থেকে ৬৩ পয়সা
সুন্দরবন গ্যাস: ২৪ পয়সা থেকে ১.০৫ টাকা
তিতাস গ্যাসও সিস্টেম লসের হার অনুযায়ী দুটি পৃথক প্রস্তাব দিয়েছে।
কোম্পানিগুলোর দাবি, বর্তমান বিতরণ চার্জে পরিচালন ব্যয়ও মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ায় ব্যয় আরও বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আর্থিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
আমদানিনির্ভর গ্যাসের চাপ বাড়ছে
বর্তমানে দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে এলেও ৩০ শতাংশ এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। তবে পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে আসবে এবং আমদানিনির্ভরতা বেড়ে ৭০ শতাংশে পৌঁছাবে।
দেশীয় উৎসের গ্যাসের গড় উৎপাদন খরচ মাত্র ৬.০৭ টাকা হলেও আমদানিকৃত এলএনজির কারণে সামগ্রিক গড় মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে—
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস থেকে গ্যাসের মূল্য প্রায় ১ টাকা
বাপেক্স থেকে ৪ টাকা
শেভরন থেকে প্রায় ১২ টাকা
টাল্লো থেকে প্রায় ১০ টাকা
অন্যদিকে কাতার ও ওমান থেকে আমদানিকৃত এলএনজির দাম প্রতি ঘনমিটারে ৪৪ থেকে ৪৬ টাকার সমপর্যায়ে পৌঁছেছে।
অনুসন্ধানে ধীরগতি, বাড়ছে সংকট
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস সংকটের অন্যতম কারণ দীর্ঘদিন ধরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও কার্যক্রমের ঘাটতি।
১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিমালায় প্রতিবছর অন্তত চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও কোনো সরকারই ধারাবাহিকভাবে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।
একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১,৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এর ফলে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিদ্যমান অনেক শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জ্বালানি খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হতে পারে টেকসই সমাধান। অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবহন খাতে সিএনজি ব্যবহারকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

