দেশে গ্যাসের সংকট ও সরবরাহ ঘাটতি দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধীরগতি এবং ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের অভিযোগ, দেশীয় উৎস থেকে তুলনামূলক কম ব্যয়ে গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকলেও এলএনজি আমদানি ও নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এলএনজি নির্ভরতা বাড়তে থাকলে একদিকে গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং সাধারণ গ্রাহকের গ্যাসের দামের ওপর পড়তে পারে।
এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলএনজি আমদানিতে বছরে গড়ে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। গত বছর এ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধেই এলএনজি আমদানির ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একই সময়ে ভর্তুকির পরিমাণও ১৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ওঠানামা করায় দীর্ঘমেয়াদে এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। কারণ এলএনজি আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়ের ওপর।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি
দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যয় এলএনজি আমদানির তুলনায় অনেক কম। ফলে নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় পাইপলাইন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি—বাপেক্সকে শক্তিশালী করার উদ্যোগের কথা বলা হলেও নতুন কূপ খনন, অনুসন্ধান কার্যক্রম এবং গ্যাস পরিবহনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে একদিকে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে না, অন্যদিকে চাহিদা মেটাতে বাড়ছে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা।
পুরোনো দুই টার্মিনালেই নানা সমস্যা, তবু নতুনের উদ্যোগ
দেশে বর্তমানে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। টার্মিনাল দুটির বয়স এখনো এক দশক পূর্ণ না হলেও বিভিন্ন সময় কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা ও পরিচালনাগত সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ত্রুটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে টার্মিনালের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একটি টার্মিনাল দুর্ঘটনাজনিত কারণে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার কথাও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে সামিটের টার্মিনাল সচল থাকার পরও সেখান থেকে এলএনজি খালাস নিয়ে জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে কার্গো খালাস করা সম্ভব না হলে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ বা জরিমানার বোঝা বহন করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চার নতুন টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন
বিদ্যমান অবকাঠামোর নানা সমস্যা ও এলএনজি আমদানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মধ্যেই আরও কয়েকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। সম্প্রতি আরও তিনটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সক্ষমতা না বাড়িয়ে একের পর এক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশ কি দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে?
তাদের মতে, টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের বিষয়গুলোও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বেশি দামে আমদানি, বাড়তে পারে গ্যাসের দাম
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে এলএনজি আমদানির চুক্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি আমদানি হলে সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
পেট্রোবাংলার পরামর্শে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ওপরও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘দেশের স্বার্থের সঙ্গে আপস নয়’
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, জনগণের সরকার হিসেবে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, এটি জনগণের সরকার। মানে, এটি আপনাদের সরকার। এই কাজ করতে গিয়ে আমরা কোনো জায়গায় দেশের স্বার্থের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করব না, ইনশাআল্লাহ।”
এলএনজির দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এলএনজির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কতটা যৌক্তিক, তা গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ এলএনজি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
অন্যদিকে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনা ও চুক্তির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তার মতে, কোন কাজ কত দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে, তা চুক্তিতে স্পষ্ট থাকা উচিত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক জরিমানার আওতায় আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এলএনজি খালাসে বিলম্বের আর্থিক দায় সরকারকেই বহন করতে হচ্ছে—যা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের আগে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দেশীয় গ্যাসই কি টেকসই সমাধান?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এলএনজি হয়তো স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলার একটি উপায় হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য শুধু আমদানিনির্ভর অবকাঠামো বাড়ানো যথেষ্ট নয়।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপের উৎপাদন বাড়ানো, পাইপলাইন অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং গ্যাস ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দেশীয় উৎসের সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে ক্রমাগত ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হলে গ্যাসের সংকট হয়তো সাময়িকভাবে কমবে, কিন্তু এর বিপরীতে অর্থনীতির ওপর তৈরি হবে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ। তাই নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোকে জ্বালানি নীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার করার দাবি উঠেছে।

