বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প আবারও এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘদিনের মূল্য প্রতিযোগিতা, ক্রেতাদের কঠোর কমপ্লায়েন্স, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপ সামলে যখন নতুন প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত, ঠিক তখনই তীব্র গ্যাস সংকট শিল্পকে নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষায়, এটি আর শুধু একটি জ্বালানি সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সুনাম, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপর সরাসরি আঘাত হানতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না গেলে ক্ষতি কয়েক সপ্তাহের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজারকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর দিকে ঠেলে দিতে পারে।
গ্যাস সংকটে থমকে যাচ্ছে শিল্পাঞ্চল
বর্তমানে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, নরসিংদী ও ময়মনসিংহসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের তীব্র সংকট বিরাজ করছে। অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় চাপের তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ নেমে এসেছে একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
শিল্প মালিকরা জানান, অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন ৬০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং ইউনিটগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে উৎপাদন আংশিক স্থগিত করেছে, আবার কিছু কারখানা সীমিত পরিসরে বিকল্প জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
ডাইং ও ফিনিশিং খাত সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোশাক শিল্পের পুরো উৎপাদন চেইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং। এসব ইউনিটে নিরবচ্ছিন্ন এবং উচ্চচাপের গ্যাস ছাড়া উৎপাদন প্রায় অসম্ভব।
অনেক শিল্পাঞ্চলে যেখানে অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে চাপ নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআইয়ে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাস থাকে না।
ফলে বয়লার চালু রাখা যাচ্ছে না, স্টিমিং, কমপ্যাক্টিং, ডাবল ডাইং ও ফিনিশিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আধা-প্রস্তুত কাপড় জমে থাকায় সেলাই কারখানাও সময়মতো উৎপাদন সম্পন্ন করতে পারছে না। এতে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়ছে
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি সময়মতো মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ। এই সক্ষমতাই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর আস্থা অর্জন করেছে।
বর্তমানে এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স (জারা), মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, প্রাইমার্ক, গ্যাপ, ওয়ালমার্ট, নাইকি, লেভিস, নেক্সট, টার্গেট, ম্যাঙ্গো, পিভিএইচসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্র্যান্ড বাংলাদেশের উৎপাদন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা ইতোমধ্যে কারখানাগুলোর কাছে উৎপাদন সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও জেনারেটর ব্যবহারের তথ্য চেয়েছেন। কেউ কেউ সরাসরি কারখানা পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করছেন।
তাদের মূল প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে? ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়াতে সরকারের পরিকল্পনা কী?
জরুরি বৈঠকে বিজিএমইএ ও বায়ার্স ফোরাম
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংগঠন বায়ার্স ফোরাম বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে।
বৈঠকে বিজিএমইএ জানায়, মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে অনুরোধ জানানো হয়, ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত শিপমেন্ট বিলম্বকে কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে বিবেচনা করার জন্য।
উৎপাদনের চেয়ে বড় সংকট—আস্থা ধরে রাখা
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে অধিকাংশ পোশাক কারখানার উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। কোথাও এই হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
তার মতে, আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা।
তিনি বলেন, "একবার কোনো ব্র্যান্ড বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তুললে সেই বাজার পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।"
বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর, এলপিজি কিংবা সিএনজির মতো ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এর ফলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় অতিরিক্ত এই ব্যয় উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
ফলে লাভের মার্জিন কমে যাচ্ছে, আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপে পড়ছেন।
নারায়ণগঞ্জে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক
নিটওয়্যার শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, জেলার প্রায় এক হাজারের বেশি রপ্তানিমুখী কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। অনেক ডাইং কারখানা কার্যত বন্ধ। কিছু প্রতিষ্ঠানে মাত্র কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে।
বিকেএমইএ নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, সংকট দীর্ঘ হলে আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আরও অনেক ডাইং ইউনিট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বিশ্ব পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি সময়মতো শিপমেন্ট নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারে।
একটি অর্ডার হারানো মানে শুধু একটি চালান হারানো নয়; বরং ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন,
"বর্তমানে পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট উৎপাদন ব্যয় নয়; আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রধান শক্তি সময়মতো মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ। সেই সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে।"
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি কমানোর কৌশল অনুসরণ করছে। ফলে কোনো দেশে উৎপাদনে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেই তারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
তার মতে, স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পাঞ্চলে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে নতুন এলএনজি অবকাঠামো, স্থলভিত্তিক গ্যাস সংরক্ষণ ব্যবস্থা, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তাই এখন রপ্তানির পূর্বশর্ত
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু শিল্পের নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতের উৎপাদন ব্যাহত হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন আর কেবল বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, শিল্পায়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

