ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ: ১২০ দিনের মহাপরিকল্পনায় সরকার

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬, ০২:১২ পিএম

মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ: ১২০ দিনের মহাপরিকল্পনায় সরকার

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে মাদকের বিস্তার রোধ, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মাদক প্রবেশ বন্ধ এবং তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষায় দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। শুধু অভিযাননির্ভর ব্যবস্থা নয়, বরং প্রতিরোধ, সচেতনতা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ—এই ছয়টি স্তম্ভকে ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে নতুন কৌশল।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ১২০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ, কারবারিদের নেটওয়ার্ক এবং অর্থায়নের উৎস একযোগে ধ্বংস করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই গড়ে উঠবে মাদকবিরোধী প্রতিরোধ

সরকারের পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রমকে।

এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় সারাদেশে ২ হাজার প্রশিক্ষক (মেন্টর) তৈরি করা হবে, যারা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

এছাড়া প্রাথমিকভাবে ২০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটি নিয়মিত আলোচনা, সেমিনার, ক্যাম্পেইন এবং শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

সীমান্তে ১০০ চেকপোস্ট, দেশজুড়ে ৩৫ হাজার অভিযান

মাদকের সরবরাহ বন্ধে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বহুগুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী—

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ১০০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করা হবে।
সারা দেশে ৩৫ হাজার সাধারণ অভিযান পরিচালিত হবে।
৬০ দিনের বিশেষ অভিযানে ২০০টি নির্ধারিত টার্গেটে একযোগে অভিযান চালানো হবে।

এছাড়া জেলা, উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে মাদক ব্যবসায়ীদের হালনাগাদ ডাটাবেজ তৈরি করা হবে, যাতে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান আরও কার্যকর হয়।

প্রযুক্তিনির্ভর অভিযানে যুক্ত হচ্ছে বডি ক্যামেরা

অভিযানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি নতুন যানবাহন, কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০টি শর্ট রেঞ্জ অস্ত্র সংগ্রহের প্রস্তাব রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (INCB) সহযোগিতায় দেশে একটি ন্যাশনাল টার্গেটিং সেন্টার (NTC) প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় আরও শক্তিশালী করবে।

বিভাগীয় পর্যায়ে ডোপ টেস্ট

সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাদকমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রথম ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালে স্ক্রিনিং ডোপ টেস্ট চালু করা হবে।

পরবর্তীতে এই কার্যক্রম ময়মনসিংহ, খুলনা ও রংপুর বিভাগেও সম্প্রসারণ করা হবে।

মাদকের অর্থের উৎস শনাক্তে বিশেষ প্রশিক্ষণ

মাদক ব্যবসার আর্থিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে ৫০ জন কর্মকর্তাকে মানি লন্ডারিং বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

একইসঙ্গে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে।

জেলা-উপজেলায় গঠিত হবে ‍‍`মাদকবিরোধী ব্রিগেড‍‍`

তরুণদের সম্পৃক্ত করতে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে মাদকবিরোধী ব্রিগেড গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব ব্রিগেডে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে যুক্ত করা হবে, যাতে সামাজিক প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হয়।

এছাড়া দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় কর্মশালা এবং সাধারণ মানুষের মতামত জানার জন্য গণশুনানিরও আয়োজন করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মত

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন,

"মাদকবিরোধী লড়াই শুধু অভিযান দিয়ে সফল হবে না। প্রতিরোধ, সচেতনতা, গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস—সবগুলো বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।"

র‍্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলাম বলেন,

"বর্তমানে মাদক সিন্ডিকেট প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কে পরিচালিত হচ্ছে। তাই তথ্য বিনিময়, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতেই হবে।"

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন,

"মাদক একটি সামাজিক সংকট। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিরোধমূলক শিক্ষা ও সচেতনতার বিকল্প নেই।"

ডিএনসি মহাপরিচালক: জিরো টলারেন্স নীতি

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন,

"আমরা ১২০ দিনের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছি। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। লক্ষ্য শুধু মাদক উদ্ধার নয়, বরং মাদক সিন্ডিকেটের অর্থায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া।"

তিনি জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মেন্টর তৈরি, আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের আশা করছে সরকার।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!