রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে চাকরি হারানো ১ হাজার ৫২২ জন পুলিশ সদস্য ও কর্মচারীকে অবিলম্বে পুনর্বহালের দাবিতে রাজধানীতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। তারা অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত বা ন্যায়সঙ্গত বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কিংবা বিভিন্নভাবে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘ভিকটিম পুলিশ পরিবার’ ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা দ্রুত পুনর্বহাল, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
‘সদর দপ্তরের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি’
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যদের পুনর্বহালের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ সদর দপ্তর একজন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি)-এর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তাদের দাবি, দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে কমিটি চার দফা সুপারিশ জমা দেয়। এর মধ্যে তৃতীয় সুপারিশে আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ত্রুটি ও অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করা হয়। ভুক্তভোগীদের মতে, এই সুপারিশই প্রমাণ করে যে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত ছিল অন্যায্য, ত্রুটিপূর্ণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
‘ঘোষণা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি’
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ মিডিয়া সেল থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছিল যে, চাকরিচ্যুত ১ হাজার ৫২২ জন সদস্যকে দ্রুত চাকরিতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
কিন্তু পরবর্তীতে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। ফলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও পুনর্বহালের বিষয়টি এখনও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
‘১৫২২ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো পরিবার’
বক্তারা বলেন, চাকরিচ্যুত হয়েছেন ১ হাজার ৫২২ জন সদস্য, কিন্তু এর প্রভাব পড়েছে হাজারো পরিবারের ওপর। দীর্ঘদিন চাকরি না থাকায় অনেকেই চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, কেউ চিকিৎসা করাতে পারছেন না, আবার অনেকে সামাজিকভাবে অবহেলা ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে জীবনযাপন করছেন।
তাদের ভাষায়, “এটি শুধু চাকরি হারানোর বিষয় নয়; এটি হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা, সম্মান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি মানবিক সংকট।”
প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আন্তরিক সিদ্ধান্তই দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা পরিবারগুলোর জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।
তারা বলেন, “আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। শুধু ন্যায়বিচার চাই। যদি তদন্তে আমাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত না হয়, তাহলে আমাদের চাকরি ও সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হোক।”
কনস্টেবল রাশিদুলের জীবনের গল্প
মানববন্ধনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাবেক পুলিশ কনস্টেবল মো. রাশিদুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন তিনি। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় ২০০০ সালে পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।
তিনি বলেন, “পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত—এই অভিযোগে আমাকে বরখাস্ত করা হয়। তখন আর্থিক সংকটের কারণে আদালতে আইনি লড়াই চালাতে পারিনি। এখন জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা চালিয়ে কোনো রকমে পরিবার চালাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানবিক বিবেচনায় পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দিলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত এ জটিলতা নিরসনের আহ্বান জানান তিনি।
দ্রুত সিদ্ধান্তের দাবি
মানববন্ধন শেষে আয়োজকরা বলেন, পুনর্বহাল সংক্রান্ত সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যদের চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হলে শুধু তাদের নয়, হাজারো পরিবারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের অবসান ঘটবে।
তারা সরকারের প্রতি তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা এবং বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানান।

