ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

পূর্ণ সক্ষমতা ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে

রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষণগণনা, আগস্টেই জাতীয় গ্রিডে প্রথম ৩০০ মেগাওয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ১০:২৩ এএম

রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষণগণনা, আগস্টেই জাতীয় গ্রিডে প্রথম ৩০০ মেগাওয়া

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর (আরএনপিপি) থেকে আগামী আগস্টের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। আর সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন দুই ইউনিটবিশিষ্ট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, রোসাটম এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের রিয়্যাক্টরে ইতোমধ্যে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া চালু ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিয়্যাকশন নিশ্চিত করার কাজ চলছে।

গত ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর চুল্লিতে নিউট্রন দ্বারা ফিশন বিক্রিয়া শুরু হবে, যা থেকে বিপুল তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপ দিয়ে পানি বাষ্পে রূপান্তর করা হবে এবং উচ্চচাপের বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিশন বিক্রিয়া নিরাপদভাবে চালু করে ধাপে ধাপে এক শতাংশ, দুই শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ ক্ষমতায় উৎপাদন পরীক্ষা সম্পন্ন করতে প্রায় ৩৪ থেকে ৪০ দিন সময় লাগে। প্রতিটি ধাপেই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা হয়।

আগস্টেই পরীক্ষামূলক উৎপাদনের লক্ষ্য

রোসাটমের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া করা হবে না। প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে। সে অনুযায়ী আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

পরবর্তী কয়েক মাসে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধি করে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিটের ১২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

দুই ইউনিটে উৎপাদন হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রয়েছে দুটি ভিভিইআর-১২০০ (VVER-1200) থ্রিজি প্লাস প্রযুক্তির রিয়্যাক্টর। প্রতিটি ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।

প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী বছর দ্বিতীয় ইউনিটেও ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

সরকারের আশাবাদ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, "আমরা ২০২৬ সালের মধ্যেই পূর্ণ উৎপাদনে যাওয়ার চেষ্টা করছি। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা আগস্টের শেষ সপ্তাহে ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের বিষয়ে আশাবাদী। প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করেই উৎপাদনে যাওয়া হবে।"

রাশিয়ার সহযোগিতায় বাস্তবায়ন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন রোসাটমের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্পের জ্বালানি ইউরেনিয়াম-২৩৫ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় রাশিয়া সরবরাহ করবে।

এছাড়া ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি (স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল) ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও রাশিয়ার। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট স্বাক্ষরিত আন্তঃসরকার চুক্তি অনুযায়ী ব্যবহৃত জ্বালানি নিরাপদভাবে সংরক্ষণ শেষে নির্ধারিত সময়ে রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে।

বাংলাদেশিদের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব

প্রকল্পের নির্মাণ শেষ হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ (NPCBL)। ইতোমধ্যে রাশিয়ায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের একটি দক্ষ দল গড়ে তোলা হয়েছে।

তবে শুরুতে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে কেন্দ্র পরিচালিত হবে। এরপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে পুরো পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত জনবল গ্রহণ করবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে গেলে জাতীয় গ্রিডে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ট্যাগ:

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!