ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

অর্থনীতিতে ‘নীরব রক্তক্ষরণ’

গ্যাস সংকটে থমকে রাজধানী, নষ্ট লাখো কর্মঘণ্টা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ১, ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম

গ্যাস সংকটে থমকে রাজধানী, নষ্ট লাখো কর্মঘণ্টা

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর প্রায় প্রতিটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে এখন একই দৃশ্য—ভোরের আলো ফোটার আগেই দীর্ঘ সারি, আর গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের অপেক্ষায় শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মাইক্রোবাস। কোথাও তিন ঘণ্টা, কোথাও পাঁচ ঘণ্টা, আবার অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে মাত্র ৭০ থেকে ২০০ টাকার গ্যাস।

এই সংকট এখন আর কেবল চালকদের দুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি ঘাটতির কারণে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, পরিবহন ব্যবস্থা ধীর হয়ে পড়ছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ‘নীরব রক্তক্ষরণ’।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মক্ষম মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের উৎপাদনশীলতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকেই সংকট

বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি (FSRU) টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও যান্ত্রিক ত্রুটি।

এর ফলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে যায়।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ সরবরাহ নেমে এসেছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, আবাসিক গ্রাহক এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশন—সব খাতেই দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট।

রাজধানীজুড়ে একই চিত্র

তেজগাঁও, মগবাজার, মালিবাগ, গাবতলী, কাওরান বাজার, যাত্রাবাড়ী, বনশ্রী, খিলগাঁও, বাড্ডা, উত্তরা, মিরপুর, মতিঝিল, সবুজবাগ, ফকিরাপুলসহ রাজধানীর প্রায় সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনে এখন দীর্ঘ লাইন।

চালকদের অভিযোগ—

গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
কোথাও কোথাও ৫-৬ ঘণ্টা পরও পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না।
অনেক স্টেশনে মাত্র এক থেকে দেড় ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহের পরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই মাত্র ৮০-১০০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন।
প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে লাখো কর্মঘণ্টা

একজন সিএনজি চালক সাধারণ সময়ে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ১২ থেকে ১৫টি ট্রিপ সম্পন্ন করতে পারেন।

কিন্তু বর্তমানে গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় হারিয়ে ফেলছেন তারা।

ফলে—

দৈনিক ট্রিপ কমে যাচ্ছে।
আয় কয়েকশ টাকা পর্যন্ত কমে যাচ্ছে।
যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
শহরের যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলেও প্রভাব পড়ছে।

বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, যদি মাত্র এক লাখ চালক প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা করে লাইনে দাঁড়ান, তাহলে একদিনেই নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ কর্মঘণ্টা।

আর যদি দুই লাখ যানবাহন এই সংকটে পড়ে, তাহলে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে ৬ লাখ কর্মঘণ্টা।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি এমন এক উৎপাদন ক্ষতি যা জিডিপির হিসাবের বাইরে থাকলেও জাতীয় অর্থনীতির গতি কমিয়ে দেয়।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন,

"গ্যাস সংকটের কারণে চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়া শুধু তাদের ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টারও বড় অপচয়।"

তিনি বলেন, এর প্রভাব ধীরে ধীরে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে শুরু করবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন,

"হারিয়ে যাওয়া উৎপাদনশীল সময় পরে আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই গ্যাস সংকট কেবল জ্বালানির সমস্যা নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, আয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও বড় হুমকি।"

তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে এবং শিল্প সম্প্রসারণের গতি কমিয়ে দেবে।

চালকদের আয় কমছে, বাড়ছে দুর্ভোগ

রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশনে কথা বলা চালকদের অভিযোগ, আগে যে সময়ে তিন-চারটি ট্রিপ দেওয়া যেত, এখন সেই সময় কেটে যাচ্ছে গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে।

ফলে—

দৈনিক আয় ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত কমে যাচ্ছে।
গাড়ির কিস্তি ও জমা তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সংসারের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

একজন চালক বলেন,

"আগে সকালে গ্যাস নিয়ে সারাদিন গাড়ি চালাতে পারতাম। এখন অর্ধেক সময়ই লাইনে দাঁড়িয়ে কাটে। আয় কমে গেছে, খরচ কমেনি।"

যাত্রীদেরও বাড়তি ভোগান্তি

গ্যাস সংকটের কারণে সড়কে সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা কমে গেছে।

ফলে—

যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অনেক এলাকায় সিএনজি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভাড়াও আগের তুলনায় বেড়ে গেছে।

চালকদের দাবি, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় সীমিত ট্রিপ দিতে হচ্ছে। তাই আগের ভাড়ায় গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

শিল্প উৎপাদনেও ধাক্কা

গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্যাসনির্ভর শিল্পখাতে।

তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পসহ বহু কারখানায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন,

"গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানির সমস্যা নয়; এটি উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতির বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং, বয়লারসহ পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এতে রপ্তানি সময়মতো করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।"

বাসাবাড়িতেও দুর্ভোগ

রাজধানীর বনশ্রী, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মতিঝিল, ফকিরাপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না।

অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। এতে বিদ্যুতের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

তাপপ্রবাহের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গ্যাস সংকট

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশ বছরে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহে কর্মঘণ্টা হারানোর সঙ্গে বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিদিনের দীর্ঘ অপেক্ষা, পরিবহন ব্যাহত হওয়া এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব যুক্ত হলে দেশের উৎপাদনশীলতার ওপর চাপ আরও বহুগুণ বাড়বে।

দ্রুত সমাধানের তাগিদ

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন,

"সিএনজি স্টেশনে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক ধরনের নীরব রক্তক্ষরণ। এতে শুধু চালকদের আয় কমছে না, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও শিল্প উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।"

তিনি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এদিকে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত সংকট পুরোপুরি কাটার সম্ভাবনা কম।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!