ঝিনাইদহ সরকারি কেশব চন্দ্র (কেসি) কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এক দিনের জন্য সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে কলেজ ক্যাম্পাসে সব ধরনের সভা, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মাসরুর উল আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) কলেজের সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
জরুরি একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সিদ্ধান্ত
কলেজ প্রশাসন জানিয়েছে, বুধবার কলেজের ১১৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কলেজ ক্যাম্পাসে সব ধরনের সভা, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বৃহস্পতিবার সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কলেজ কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের ফলে নির্ধারিত ক্লাস ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম এক দিনের জন্য স্থগিত থাকবে।
ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা
কলেজ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে পরিস্থিতি কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং শহরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পৃথকভাবে পাল্টাপাল্টি মিছিল করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ঘটনার পর ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় কলেজ প্রশাসন জরুরি একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধসহ শিক্ষা কার্যক্রম এক দিনের জন্য স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়।
ছাত্রদলের বক্তব্য কী
কেসি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি বাবর আলী মাহফুজ দাবি করেন, ছাত্রশিবিরের এক কর্মী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে কটূক্তি করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বলে তারা জানতে পারেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি জানার পর শিবির নেতৃবৃন্দকে পোস্টটি মুছে ফেলতে বলা হয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে কলেজ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তবে তিনি বলেন, শিবিরের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার কলেজে নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠানের আয়োজনের সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।
বাবর আলী মাহফুজের ভাষায়, “তারা অনুষ্ঠান করবে কি না, সেটি তাদের বিষয়। এ নিয়ে ছাত্রদলের কোনো আপত্তি নেই। তাদের সঙ্গে যে ঝামেলা হয়েছে, সেটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নয়। বর্তমানে কলেজ ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।”
ছাত্রশিবিরের বক্তব্য
অন্যদিকে, কেসি কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাহবুব ইসলাম বলেন, কয়েকদিন ধরে কলেজ ক্যাম্পাসে সংগঠনের উদ্যোগে নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকালে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের কথা ছিল এবং এ উপলক্ষে অতিথিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
মাহবুব ইসলাম বলেন, গত ৫ অক্টোবর ছাত্রদলের সঙ্গে একটি ঝামেলার ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনার পর কলেজ প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রশাসন অনুমতি দিলে অনুষ্ঠান হবে, অনুমতি না দিলে হবে না।”
অর্থাৎ কলেজ প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্তের কারণে পূর্বনির্ধারিত নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ
কলেজ কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে শুধু বৃহস্পতিবার শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার কথা বলা হলেও রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধের সিদ্ধান্তের মেয়াদ অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে।
এর ফলে কলেজ ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সভা, সমাবেশ, মিছিল বা রাজনৈতিক কর্মসূচি আয়োজন করা যাবে না। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কোনো কর্মসূচি আয়োজন করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিরোধ বা সংঘাতের প্রভাব যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে না পড়ে, সে বিষয়টিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রূপ নেওয়ার পর কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শিক্ষা কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিষিদ্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন কলেজ প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অধ্যক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মাসরুর উল আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁর অতিরিক্ত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কলেজ কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং ক্যাম্পাসে সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
এখন পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং পরবর্তী সময়ে কলেজ প্রশাসন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর রয়েছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

