ঢাকা বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

“সম্পর্কের বরফ গলাতে উদ্যোগ: দিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক কাল”

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

“সম্পর্কের বরফ গলাতে উদ্যোগ: দিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক কাল”

ছবিঃ সংগৃহীত

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। এর অংশ হিসেবে বাণিজ্য ও কনস্যুলার বিষয়ে দুই দেশের যৌথ কার্যনির্বাহী দলের (জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ) বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠক আগামী ৮ ও ৯ অক্টোবর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠক ঢাকায় আয়োজনের জন্য দুই দেশ তারিখ নির্ধারণের কাজ করছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এর প্রতিবেদনে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বাণিজ্যবিষয়ক বৈঠকে অংশ নিতে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল বুধবার নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। আগে প্রতিনিধি দলের মঙ্গলবার যাওয়ার কথা ছিল এবং বৈঠক ৭ ও ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও যাতায়াত ও লজিস্টিক জটিলতার কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বাণিজ্যবিষয়ক আলোচনায় গুরুত্ব পাবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য

দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিভিন্ন সমস্যা, বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামো এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও কার্যকর ও পূর্বানুমানযোগ্য করার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যেসব জটিলতা রয়েছে, সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

তবে শুধু বাণিজ্যবিষয়ক বৈঠকেই দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সব বিষয় সমাধান হবে না। ট্রানজিট, সীমান্ত বাণিজ্য এবং সীমান্তকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলোর বৈঠকও প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাণিজ্যসচিব পর্যায়ের বৈঠক নিয়েও আলোচনা

বাংলাদেশ চেয়েছিল, বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠকের পর দুই দেশের বাণিজ্যসচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হোক। তবে ভারতীয় পক্ষ থেকে ঢাকাকে জানানো হয়েছে, ট্রানজিট ও সীমান্ত বাণিজ্যসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বৈঠক শেষ হওয়ার পর বাণিজ্যসচিব পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করা সম্ভব হবে।

এতে বোঝা যাচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি পরিবহন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও ধাপে ধাপে আলোচনায় আনার চেষ্টা চলছে।

ভিসা জটিলতা নিরসনে কনস্যুলার বৈঠক

দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভিসা প্রদান ও কনস্যুলার সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের বিষয়ে এ বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দুই দেশই ভিসা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে কাজ করছে। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন জটিলতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে দুই দেশের নাগরিকদের ভ্রমণ, ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনে ভিসা প্রক্রিয়া নিয়ে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকায় কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠক আয়োজন করা হলে এসব বিষয়ে সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সম্পর্কে টানাপোড়েন

২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে দৃশ্যমান টানাপোড়েন তৈরি হয়।

দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ, সীমান্ত, ভিসা, বাণিজ্য ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে নানা ধরনের মতপার্থক্য দেখা দেয়। একই সময়ে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও দুই দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে ভারতও আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের বরাতে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

তারেক রহমানের ভারত সফর এখনো অনিশ্চিত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সফরের সময় নির্ধারণে ভারতের ব্যস্ত কূটনৈতিক সূচিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অক্টোবরে ভারতের কূটনৈতিক কর্মসূচিতে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিন এবং পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের সফর রয়েছে।

নভেম্বরে ১৬ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত ফিলিপাইনে অনুষ্ঠেয় আসিয়ান সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ডিসেম্বরেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সফরসূচি রয়েছে। ওই মাসে তাঁর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও বেলজিয়াম সফরের কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও অক্টোবরে জাপান এবং নভেম্বরে তুরস্ক ও সৌদি আরব সফরের কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ফলে দুই দেশের সরকারপ্রধানের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচির কারণে সম্ভাব্য ভারত সফরের সময় নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

বিমসটেক ও ব্রিকস ঘিরেও ছিল কূটনৈতিক তৎপরতা

বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ভারতীয় পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ গত মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেয়নি। এর ফলে বহুপক্ষীয় পরিসরে দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়।

তবে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে বাণিজ্য ও কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠকের উদ্যোগকে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ পুনরায় জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সামনে আরও কয়েকটি সংবেদনশীল ইস্যু

কূটনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বাণিজ্য ও ভিসা সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। ট্রানজিট, সীমান্ত বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক যোগাযোগসহ আরও কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা প্রয়োজন।

বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ও কনস্যুলার সহযোগিতা পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক ও কৌশলগত কিছু প্রশ্নের সমাধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক ও নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে। বাণিজ্য ও কনস্যুলার পর্যায়ের বৈঠকের পর যদি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগও বাড়ে, তাহলে দীর্ঘদিনের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ধাপে ধাপে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা

সব মিলিয়ে বাণিজ্য ও কনস্যুলার বিষয়ে যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠকের প্রস্তুতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নয়াদিল্লিতে বাণিজ্যবিষয়ক বৈঠক এবং ঢাকায় সম্ভাব্য কনস্যুলার বৈঠকের মধ্য দিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাস্তব সমস্যা নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ পাবেন।

তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের পরবর্তী ধাপ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ফলে আসন্ন যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠকগুলো দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় কতটা গতি আনে, সেটিই এখন কূটনৈতিক মহলের অন্যতম আগ্রহের বিষয়।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!