ঢাকা বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

উৎপাদন থেকে ভোক্তার প্লেট: আমাদের ফসল কতটা নিরাপদ?

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১০:২৪ এএম

উৎপাদন থেকে ভোক্তার প্লেট: আমাদের ফসল কতটা নিরাপদ?

ছবিঃ সংগৃহীত

ক্ষেতজুড়ে সবুজের সমারোহ। কৃষকের ঘামে ফলছে বেগুন, শসা, টমেটোসহ নানা ধরনের সবজি। ক্ষেত থেকে সেসব সবজি যাচ্ছে স্থানীয় আড়তে, সেখান থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে পৌঁছে যাচ্ছে ভোক্তার রান্নাঘরে। প্রতিদিনের খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা এসব সবজি দেখতে সতেজ হলেও উৎপাদন থেকে ভোক্তার প্লেট পর্যন্ত পুরো যাত্রায় সেগুলোর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে—এ প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় বিভিন্ন সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব উপাদানের গড় মাত্রা অনুমোদিত সীমার চেয়েও বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে বেগুন, শসা ও টমেটোর মতো বহুল ব্যবহৃত সবজি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শুধু উৎপাদন পর্যায়েই নয়, বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা ঝুঁকি। কোথাও নোংরা পানিতে সবজি ধোয়া হচ্ছে, কোথাও আবার কীটনাশক ব্যবহারের পর প্রয়োজনীয় অপেক্ষার সময় না মেনেই ফসল বাজারে চলে আসছে। ফলে ভোক্তার চোখে সতেজ ও ভালো দেখতে একটি সবজি বাস্তবে কতটা নিরাপদ, তা শুধু বাহ্যিক চেহারা দেখে বোঝার সুযোগ নেই।

কৃষকের ভরসা কীটনাশকের দোকানি

বেগুনের ক্ষেতে পোকা বা রোগবালাই দেখা দিলে কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে অনেক কৃষক স্থানীয় কীটনাশকের দোকানির ওপর নির্ভর করেন।

গ্রাম পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তার নিয়মিত পরামর্শ না পাওয়া, কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং রোগ-পোকা শনাক্ত করার সীমিত সক্ষমতার কারণে কীটনাশকের দোকানিই অনেক সময় কৃষকের প্রধান পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন।

কৃষকের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিতে পোকা বা রোগ দেখা দিলে তারা দোকানিকে সমস্যার কথা জানান। এরপর দোকানি বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য ও পরামর্শের ভিত্তিতে কীটনাশক সরবরাহ করেন। কিন্তু কীটনাশক ব্যবহারের পর কতদিন অপেক্ষা করে ফসল সংগ্রহ করতে হবে, নির্ধারিত মাত্রার বেশি প্রয়োগ করলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে—এসব বিষয়ে অনেক কৃষক পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না।

ফলে কীটপতঙ্গ দমনে ব্যবহৃত রাসায়নিকের একটি অংশ ফসলের গায়ে বা ভেতরে অবশিষ্ট থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ম্যানকোজেব ও কারটাপ নিয়ে উদ্বেগ

কীটনাশকের দোকানগুলোতে পাওয়া বিভিন্ন রাসায়নিকের মধ্যে ম্যানকোজেব ও কারটাপ গ্রুপের উপাদান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এসব রাসায়নিকের বিষাক্ততা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে এবং কিছু দেশে নির্দিষ্ট উপাদানের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ফলে কৃষিতে কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুমোদিত তালিকা, নির্ধারিত মাত্রা এবং নিরাপদ ব্যবহারের নির্দেশনা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কীটনাশক বাজারে থাকা মানেই সেটি সব পরিস্থিতিতে ব্যবহারযোগ্য—এমন ধারণা সঠিক নয়। ফসল, পোকা, প্রয়োগের মাত্রা, আবহাওয়া এবং ফসল সংগ্রহের আগে অপেক্ষার সময়—সবকিছু বিবেচনা করে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়।

ক্ষেত থেকে আড়ত, তারপর বাজার

ক্ষেত থেকে বেগুন তোলার পর শুরু হয় তার দীর্ঘ বাজারযাত্রা। প্রথমে কৃষকের বাড়িতে এনে বাছাই করা হয়। এরপর বস্তা বা অন্য প্যাকেটে করে পাঠানো হয় স্থানীয় আড়তে।

এই পর্যায়ে কৃষকের সরাসরি ভূমিকা অনেকটাই শেষ হয়ে যায়। এরপর পাইকার, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে সবজি পৌঁছে যায় নগরীর বাজারে।

কিন্তু এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় সবজির নিরাপত্তা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেটিই বড় প্রশ্ন।

উৎপাদন পর্যায়ে কীটনাশকের ব্যবহার যেমন নজরদারির আওতায় থাকা প্রয়োজন, তেমনি বাজারে আসার পরও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ডোবার নোংরা পানিতে সবজি ধোয়া

রাজধানীর খিলক্ষেত বাজারের চিত্রও উদ্বেগ বাড়ায়। সেখানে ডোবার নোংরা পানিতে শাক-সবজি ধুতে দেখা যায়। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত চলতে থাকে এই কার্যক্রম।

যে পানি দেখলেই সাধারণ মানুষের অস্বস্তি তৈরি হতে পারে, সেই পানিতে ধোয়া সবজিই পরে বিক্রি হচ্ছে ক্রেতাদের কাছে।

বাজারে সবজি দেখতে সতেজ রাখার জন্য অনেক ব্যবসায়ী পানি ব্যবহার করেন। কিন্তু পানি যদি দূষিত হয়, তাহলে সবজি ধোয়ার উদ্দেশ্যই উল্টো ফল দিতে পারে। দূষিত পানি থেকে জীবাণু বা অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান সবজিতে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ বিষয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা যায় না। ব্যবসায়িক বাস্তবতা, সংরক্ষণের সুবিধা এবং সবজিকে সতেজ দেখানোর প্রবণতার মধ্যেই অনেক সময় খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি আড়ালে থেকে যায়।

শুধু দেখে নিরাপদ সবজি চেনার উপায় নেই

বাজারে গিয়ে একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে শুধু চোখে দেখে বোঝার সুযোগ নেই যে একটি বেগুন, শসা বা টমেটোতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ রয়েছে কি না।

সবজি সতেজ, চকচকে বা দেখতে ভালো হলেই সেটি রাসায়নিকমুক্ত—এমন ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

আবার অনেকে মনে করেন, বাড়িতে এনে সবজি বেশি করে ধুলে কিংবা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে সব ধরনের ক্ষতিকর উপাদান দূর হয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়।

ভালোভাবে ধোয়া সবজির পৃষ্ঠে থাকা কিছু ময়লা ও নির্দিষ্ট কিছু অবশিষ্টাংশ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে সব ধরনের কীটনাশক বা ভারী ধাতু সম্পূর্ণভাবে দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিশেষ করে কোনো রাসায়নিক যদি উদ্ভিদের টিস্যুর ভেতরে প্রবেশ করে থাকে, শুধু পানি দিয়ে ধোয়ার মাধ্যমে তা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নাও হতে পারে।

গবেষণায় অনুমোদিত সীমার বেশি অবশিষ্টাংশ

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় বিভিন্ন সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। কিছু গবেষণায় এসব উপাদানের গড় মাত্রা অনুমোদিত সীমার তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে।

বেগুন, শসা ও টমেটোর মতো সবজি এ ধরনের গবেষণায় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

এর অর্থ এই নয় যে বাজারে থাকা প্রতিটি বেগুন, শসা বা টমেটোই বিষাক্ত। বরং গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত করছে—কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত বিরতি এবং বাজার পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

‘সাত দিন অপেক্ষার কথা, তিন দিনেই বাজারে’

খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ইনস্টিটিউটের গবেষক অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান বলেন, কীটনাশক প্রয়োগের পর ফসল সংগ্রহের আগে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত পেস্টিসাইড প্রয়োগের পর সাত দিন অপেক্ষা করে ফসল সংগ্রহের কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কৃষক তিন দিন পরই ফসল বাজারে নিয়ে আসেন।

এভাবে নির্ধারিত সময়ের আগে ফসল সংগ্রহ করলে সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের মতে, এ ধরনের সবজি দীর্ঘদিন খাওয়ার ফলে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন।

তবে তিনি একই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলেন, কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে মানেই সবজি বিষাক্ত—এমনটি নয়। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, সঠিক নিয়ম না মানা এবং ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত সময় অপেক্ষা না করাই মূল উদ্বেগের বিষয়।

কৃষককে দোষ দিয়ে সমাধান নয়

সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি কমাতে শুধু কৃষকদের দায়ী করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

কৃষক কেন অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছেন, কেন নির্ধারিত সময়ের আগে ফসল তুলছেন এবং কীভাবে তারা কীটনাশকের পরামর্শ পাচ্ছেন—এসব বিষয়ও দেখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরামর্শ বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে কীটনাশকের সঠিক মাত্রা, প্রয়োগ পদ্ধতি, নিরাপদ অপেক্ষার সময় এবং বিকল্প বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে।

একই সঙ্গে কীটনাশক বিক্রেতাদেরও প্রশিক্ষণ ও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।

সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে নজরদারি প্রয়োজন

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু কৃষকের জমিতে পরীক্ষা চালালেই হবে না। ক্ষেত থেকে ভোক্তার প্লেট পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

কীটনাশক বিক্রি ও ব্যবহারের পর্যায়ে নজরদারি, কৃষকের প্রশিক্ষণ, ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত বিরতি, আড়ত ও বাজারে খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নিরাপদ পানি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশ করা হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—তিন পক্ষই সচেতন হবে। একই সঙ্গে নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাজারে নিরাপদ সবজি সরবরাহের চাপও বাড়বে।

ভোক্তার করণীয় কী?

ভোক্তার পক্ষ থেকেও কিছু সতর্কতা জরুরি। বাজার থেকে সবজি কেনার সময় অতিরিক্ত পচা, দুর্গন্ধযুক্ত বা অস্বাভাবিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সবজি এড়িয়ে চলা, পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধোয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খোসা ছাড়িয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু বাসায় ধোয়ার ওপর নির্ভর করে খাদ্য নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

কারণ কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, ফসল সংগ্রহের সময়সীমা এবং বাজারে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর।

নিরাপদ খাবারের নিশ্চয়তা কোথায়?

প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে সবজি থাকা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই সবজি উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত কতটা নিরাপদ থাকছে, সেটি নিশ্চিত না করা গেলে খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন।

তাই কৃষককে সঠিক পরামর্শ দেওয়া, কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত রাসায়নিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত সময় মানা, বাজারে পরিষ্কার পানি ব্যবহার এবং নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে সবজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

ক্ষেতের সবুজ সবজি যেন শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকির কারণ না হয়—এ জন্য উৎপাদক, ব্যবসায়ী, সরকারি সংস্থা এবং ভোক্তা—সব পক্ষের সমন্বিত নজরদারিই এখন সবচেয়ে জরুরি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!