জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ব্যাংক হিসাব, ভূমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা, সড়ক পরিবহন, সঞ্চয়পত্র এবং বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য এনবিআরের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্ত এবং তাদের আয় ও সম্পদের একটি সমন্বিত পরিচিতি তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে সংসদীয় কমিটিতে।
এর ফলে কোনো ব্যক্তি আয়কর বিবরণীতে যে আয় ও সম্পদের তথ্য দিচ্ছেন, তা তাঁর ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাট, গাড়ি, সঞ্চয়পত্র কিংবা বিদেশ ভ্রমণের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হবে। এতে আয় গোপন, সম্পদের তথ্য কম দেখানো কিংবা প্রকৃত করযোগ্য আয় আড়াল করার মতো প্রবণতা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
গত রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
এক ব্যক্তির আয়-সম্পদের ‘ডিজিটাল প্রোফাইল’ তৈরির পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত তথ্য সমন্বয় ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে একজন করদাতার আর্থিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন উৎসের তথ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা।
বর্তমানে একজন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব এক জায়গায়, জমি বা ফ্ল্যাটের তথ্য অন্য দপ্তরে, গাড়ির তথ্য সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে, সঞ্চয়পত্রের তথ্য আলাদা ব্যবস্থায় এবং বিদেশ ভ্রমণের তথ্য সীমান্ত ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকে।
এসব তথ্য যদি আইনগত কাঠামোর মধ্যে এনবিআরের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সমন্বিত করা যায়, তাহলে কোনো ব্যক্তির ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে তাঁর বাস্তব আর্থিক কর্মকাণ্ডের একটি তুলনামূলক চিত্র তৈরি করা সম্ভব হবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যক্তি আয়কর বিবরণীতে তুলনামূলক কম আয় দেখালেও তাঁর নামে একাধিক ফ্ল্যাট, জমি, গাড়ি, বড় অঙ্কের ব্যাংক লেনদেন বা উল্লেখযোগ্য সঞ্চয়পত্র থাকলে সেই তথ্য ঝুঁকি বিশ্লেষণে উঠে আসতে পারে। একইভাবে বিদেশ ভ্রমণের ধরন ও আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেও অসামঞ্জস্য থাকলে সেটি কর প্রশাসনের নজরে আসতে পারে।
তবে এমন তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্য ব্যবহারের আইনি অনুমোদন এবং নির্ধারিত গোপনীয়তা বিধি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এআই দিয়ে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্ত
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় শুধু তথ্য সংরক্ষণ নয়, বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সম্ভাব্য করদাতা এবং উচ্চ ঝুঁকির করদাতাদের শনাক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এতে কোনো ব্যক্তির কর বিবরণী, সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটিকে ঝুঁকির সূচক হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।
এর ফলে কর কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনুমান বা পছন্দের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এআইয়ের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর ফাঁকিদাতা হিসেবে চিহ্নিত না করে ঝুঁকি যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন করা এবং পরবর্তী পর্যায়ে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন হবে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাবও যাচাইয়ের সুপারিশ
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে শুধু সাধারণ করদাতাদের তথ্য নয়, এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিটি এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, চেয়ারম্যান এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আয়, ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের বিবরণী দাখিল নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে এসব সম্পদের তথ্য নিয়মিতভাবে যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিটির সদস্য মো. সাইফুল আলম বিষয়টি বিশেষভাবে উত্থাপন করেন। আলোচনার পর এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আয়-সম্পদের তথ্যের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এনবিআরের পক্ষ থেকে বৈঠকে জানানো হয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২৫ সালে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সম্পদের বিবরণী দাখিল করেছেন। পরবর্তী বছরগুলোতেও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে ব্যয় ২১ পয়সা
রাজস্ব আদায়ের প্রশাসনিক ব্যয় নিয়েও বৈঠকে তুলনামূলক তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
উপস্থাপিত হিসাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে প্রশাসনিক ব্যয় ২১ পয়সা। একই পরিমাণ রাজস্ব আদায়ে জাপানে ব্যয় হয় ১ টাকা ৩ পয়সা, থাইল্যান্ডে ৭১ পয়সা এবং ভারতে ৬০ পয়সা।
অর্থাৎ বৈঠকে উপস্থাপিত তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী, রাজস্ব সংগ্রহের প্রশাসনিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে রাজস্ব আদায় করছে।
তবে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, তথ্য অবকাঠামো এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতার প্রয়োজনও বাড়বে বলে মনে করছে কমিটি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। গত ২৫ বছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় প্রায় ২০ দশমিক ৬ গুণ বেড়েছে।
এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
এই লক্ষ্যমাত্রা মোট বাজেট ব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সরকারের মোট রাজস্বের ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশের সমান বলে বৈঠকে জানানো হয়।
তবে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দিয়ে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করে নতুন করদাতা শনাক্ত এবং করের আওতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
টিআইএন আছে ১ কোটি ৩০ লাখের, রিটার্ন দেন ৪৭ লাখ
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারী ব্যক্তি রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তি আয়কর বিবরণী দাখিল করেন।
অর্থাৎ টিআইএনধারীদের বড় একটি অংশ নিয়মিত আয়কর বিবরণী দাখিলের আওতায় নেই।
কমিটির মতে, এই বিপুল ব্যবধানই করের আওতা সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি করছে। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে যাঁরা প্রকৃতপক্ষে করযোগ্য আয় বা সম্পদের অধিকারী অথচ করব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন, তাঁদের শনাক্ত করা হলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে।
এটি ২০২৬ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের কম কর-জিডিপি অনুপাতকে রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।
এই অনুপাত বাড়াতে শুধু করের হার বাড়ানো নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, প্রকৃত আয়-সম্পদের তথ্য সংগ্রহ এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কর ব্যবস্থায় সরাসরি যোগাযোগ কমানোর উদ্যোগ
কর প্রশাসনে দুর্নীতি ও হয়রানির ঝুঁকি কমাতে করদাতা ও কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার ওপর জোর দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মানুষের সরাসরি যোগাযোগ যত বেশি থাকবে, দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা তত কঠিন হবে।
ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের বর্তমানে ১৯টি অনুমোদন এবং একটি কোম্পানি পরিচালনায় ৩০টি সনদের প্রয়োজন হয় বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। ফলে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সরাসরি যেতে হয়।
এই বাস্তবতায় আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
অনলাইনেই আয়কর, ভ্যাট ও অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা
এনবিআরের পরিকল্পনায় রয়েছে অনলাইনে আয়কর বিবরণী দাখিল, উৎসে করের তথ্য ব্যবস্থাপনা, অনলাইনে কর জমা, অনলাইনে ভ্যাট বিবরণী দাখিল এবং অর্থ ফেরত বা রিফান্ডের ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করা।
প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা চালু হলে করদাতাকে বারবার সরকারি দপ্তরে গিয়ে কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে না। একই সঙ্গে কর নির্ধারণে ব্যক্তিগত প্রভাব, ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের সুযোগও কমানো সম্ভব হতে পারে।
২ শতাংশেরও কম করদাতা ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষায়
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে করদাতাদের ২ শতাংশেরও কম ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার আওতায় আসেন।
২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে যন্ত্রনির্ভর পদ্ধতিতে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার জন্য করদাতা নির্বাচন করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের প্রভাব কমিয়ে তথ্য ও ঝুঁকির ভিত্তিতে করদাতা নির্বাচন করা।
ব্যবস্থা আরও কার্যকর হলে নিয়মিত করদাতাদের অযথা নিরীক্ষা বা হয়রানি কমানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি প্রকৃত আয় ও সম্পদের তুলনায় কম কর দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে নিরীক্ষার আওতায় আনা সহজ হবে।
ভ্যাট ও শুল্কেও তথ্যের সমন্বয়
আয়কর ব্যবস্থার পাশাপাশি ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থায়ও তথ্যের সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ভ্যাট ব্যবস্থায় শতভাগ অনলাইন বিবরণী দাখিল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হিসাব ব্যবস্থার সঙ্গে ভ্যাট ব্যবস্থার সংযোগ, অনলাইনে চালান ও অর্থ ফেরত এবং তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের গতিপথ শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের মধ্যে ইলেকট্রনিক ডাটা ইন্টারচেঞ্জ বা EDI ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শুল্ক ব্যবস্থায় আমদানি-রপ্তানি, পণ্যের চালান, ব্যাংক এবং বন্দরের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হলে পণ্যের মূল্য কম দেখানো, ভুল ঘোষণা কিংবা অন্যান্য ধরনের রাজস্ব অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
জনবল ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের পাশাপাশি এনবিআরের জনবল সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে।
আয়কর বিভাগে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১২ হাজার ৭৬৪টি। কিন্তু এনবিআরের সামগ্রিক জনবলের মাত্র ৫৮ শতাংশ পদ পূরণ রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
একদিকে যখন রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জনবল ও দক্ষতার ঘাটতি থাকায় প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসনের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছে কমিটি।
ভুয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা
রাজস্ব ব্যবস্থায় অনিয়ম রোধে ভুয়া বা মিথ্যা নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিলের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
দায়িত্বে অবহেলা কিংবা মিথ্যা প্রতিবেদন প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট হিসাব নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে তাঁদের সনদ বা সদস্যপদ বাতিলের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
কারণ আর্থিক প্রতিবেদন সঠিক না হলে কর প্রশাসনের তথ্যভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে কর ফাঁকি শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি নিয়মিত করদাতারাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন।
সামনে বড় পরিবর্তনের সুযোগ
এনআইডি, ব্যাংক, ভূমি, যানবাহন, সঞ্চয়পত্র ও বিদেশ ভ্রমণের তথ্যের সঙ্গে এনবিআরের তথ্যভান্ডারের সমন্বয় কার্যকর হলে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একজন করদাতার ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে তাঁর আর্থিক কর্মকাণ্ডের তথ্য তুলনা করে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র শনাক্ত করা গেলে কর ফাঁকি প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে এআই ও স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি বিশ্লেষণ ব্যবহারের ফলে কর কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীলতাও কমতে পারে।
তবে এই ব্যবস্থার সাফল্যের জন্য শুধু প্রযুক্তি চালু করাই যথেষ্ট নয়। তথ্যের নির্ভুলতা, আন্তঃসংস্থার তথ্য বিনিময়ের কার্যকর কাঠামো, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, আইনি অনুমোদন, দক্ষ জনবল এবং করদাতার অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত, কর ফাঁকি বন্ধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণ কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, তার ওপরই এই সংস্কার উদ্যোগের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে।

