রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্রমবর্ধমান চলাচল, যানজট ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে ১৮ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার। তাঁর প্রস্তাবের অন্যতম বিষয় হলো—ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করে পরিচয় যাচাই এবং তাদের মধ্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বা নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক আইডিতে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।
মো. সরওয়ারের মতে, শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত চালক, মালিক, যানবাহন ও রিকশা তৈরির উৎস সম্পর্কে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা প্রয়োজন। এতে একদিকে অবৈধ যানবাহন শনাক্ত করা সহজ হবে, অন্যদিকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো চালকের সম্পৃক্ততা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
চালকদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব
সাবেক ডিএমপি কমিশনার বলেন, রাজধানীতে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন।
এই ডাটাবেজে চালকের নাম, পরিচয়, ছবি, ঠিকানা এবং সংশ্লিষ্ট রিকশার তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি যানটির মালিকানা ও শনাক্তকারী তথ্য রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, এ ধরনের তথ্যভান্ডার থাকলে কোনো চালক বা রিকশার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দ্রুত তথ্য যাচাই করা যাবে। একই সঙ্গে একই ব্যক্তি একাধিক পরিচয়ে রিকশা চালাচ্ছেন কি না, কিংবা একটি রিকশার পরিচয় পরিবর্তন করে অন্য যান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—সেটিও নজরদারির আওতায় আনা সহজ হবে।
নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাইয়ের সুপারিশ
মো. সরওয়ারের ১৮ দফা প্রস্তাবে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বলেন, চালকদের পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে তাদের মধ্যে কেউ অপরাধী বা নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, তা শনাক্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন তিনি।
সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার ধারণা, এ ধরনের যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা থাকলে অপরাধী চক্রের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা খাতের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের নতুন করে এ পেশায় যুক্ত হওয়ার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
রিকশায় নির্দিষ্ট শনাক্তকারী নম্বর
প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশার গায়ে নির্দিষ্ট চিহ্ন বা শনাক্তকারী নম্বর দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছেন মো. সরওয়ার।
তাঁর মতে, প্রতিটি রিকশার আলাদা পরিচয় বা নম্বর থাকলে সেটির মালিক, চালক ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য সহজে যাচাই করা যাবে। এতে অবৈধভাবে নতুন রিকশা তৈরি কিংবা পুরোনো রিকশার পরিচয় পরিবর্তন করে সড়কে নামানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
এ ব্যবস্থার আওতায় রিকশার একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে দ্রুত কোনো যানবাহনের তথ্য যাচাই করতে পারবে।
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি
সাবেক ভারপ্রাপ্ত ডিএমপি কমিশনারের মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে কেবল অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত নজরদারি, তথ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রবেশ বন্ধে পুলিশের জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনে ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট গ্রুপ পুনর্নিয়োগের কথাও বলেছেন।
বিভিন্ন ফিডার রোডে ‘রিকশা ট্র্যাপার’ স্থাপনের প্রস্তাবও তাঁর ১৮ দফায় রয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রধান সড়কে ওঠার আগেই সেগুলোকে আটকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
অবৈধ চার্জিং স্টেশন বন্ধের প্রস্তাব
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে অবৈধ চার্জিং স্টেশন বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মো. সরওয়ার।
তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অবকাঠামোর ওপরও নজরদারি প্রয়োজন। অনুমোদনহীন বা অবৈধ চার্জিং স্টেশন থাকলে সেগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন তিনি।
একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশার যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও আমদানি বন্ধের বিষয়টিও ১৮ দফা প্রস্তাবে রয়েছে।
জব্দ রিকশার জন্য ডাম্পিং স্থান
অভিযানে জব্দ করা ব্যাটারিচালিত রিকশা রাখার জন্য নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্থান তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।
তাঁর মতে, অভিযানে যানবাহন জব্দ করার পর সেগুলো কোথায় রাখা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্থান থাকলে জব্দ করা যানবাহনের হিসাব ও ব্যবস্থাপনা সহজ হবে।
এতে অভিযান পরিচালনার পর জব্দ করা রিকশা আবারও অবৈধভাবে সড়কে ফিরে আসার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
চালকদের বিকল্প ই-রিকশায় পুনর্বাসনের প্রস্তাব
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চালকদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন মো. সরওয়ার।
তিনি চালকদের বিকল্প ই-রিকশায় পুনর্বাসনের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, হঠাৎ করে একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকার পথ বন্ধ না করে নিয়ন্ত্রিত ও অনুমোদিত পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এতে একদিকে রাজধানীর সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে, অন্যদিকে রিকশাচালকদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা যাবে।
যানজট ও সড়ক নিরাপত্তায় প্রভাব
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে প্রধান সড়কে এসব যানবাহনের প্রবেশ, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও পরিচয়সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।
মো. সরওয়ারের প্রস্তাবে তাই শুধু রিকশা উচ্ছেদ বা অভিযান নয়; চালক, মালিক, যানবাহন, চার্জিং স্টেশন এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহ—পুরো ব্যবস্থাকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
১৮ দফায় সমন্বিত নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর
সাবেক ভারপ্রাপ্ত ডিএমপি কমিশনারের ১৮ দফা প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হিসেবে ব্যাটারিচালিত রিকশার পরিচয় নিশ্চিতকরণ, চালকদের তথ্য সংরক্ষণ, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই, প্রধান সড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ রিকশা উৎপাদন ও চার্জিং বন্ধের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
তিনি মনে করেন, বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান পরিচালনা না করে পুলিশ, সিটি করপোরেশন, পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রাজধানীর যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নগর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হতে পারে বলে মত দিয়েছেন তিনি।

