দেশের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধ উৎপাদন অঞ্চল পাবনা। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গরুর খামার, দুধ সংগ্রহকেন্দ্র ও চিলিং সেন্টার। বাঘাবাড়ী ঘাটকে কেন্দ্র করে পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে গড়ে ওঠা এই দুগ্ধ অর্থনীতি দেশের দুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এই বৃহৎ দুধের বাজারের আড়ালে ভেজাল ও নকল দুধ তৈরির অভিযোগও ক্রমেই সামনে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, গরুর দুধ ছাড়াই পানি, তেল, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়াসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে দুধের মতো সাদা তরল তৈরি করা হচ্ছে। পরে এসব তরল স্থানীয় বাজার, চিলিং সেন্টার ও বিভিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে আসল দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় খামারি, দুগ্ধ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রমের অভিযোগ রয়েছে। তবে সব অভিযোগের স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন দাবি করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য বলছে, আধুনিক প্রযুক্তিতে দুধ পরীক্ষা করে ভেজাল বা নিম্নমানের দুধ গ্রহণ করা হয় না।
দুই শতাধিক চিলিং সেন্টার ঘিরে বড় বাজার
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলায় নামে-বেনামে দুই শতাধিক চিলিং সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ৯২টি বিভিন্ন স্বনামধন্য কোম্পানির এবং বাকিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এ ছাড়া সাঁথিয়া, বাঘাবাড়ী ও বেড়া উপজেলাতেও রয়েছে বিপুলসংখ্যক দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়।
ফলে কোনো পর্যায়ে ভেজাল দুধ আসল দুধের সঙ্গে মিশে গেলে তা শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, বৃহত্তর সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভোর ও সন্ধ্যায় কথিত নকল দুধ তৈরির অভিযোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভোর থেকে সকাল ৯টা এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কিছু এলাকায় কথিত নকল দুধ তৈরির কার্যক্রম চলে। অভিযোগ রয়েছে, সয়াবিন তেল, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়া, ডিটারজেন্ট পাউডার, কস্টিক সোডাসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে দুধের মতো সাদা তরল তৈরি করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে তরলের রং, ঘনত্ব ও চর্বির মাত্রা এমনভাবে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়, যাতে সাধারণভাবে চোখে দেখে সেটিকে আসল দুধ থেকে আলাদা করা কঠিন হয়।
তবে ঠিক কোন রাসায়নিক কী পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথায় এবং কীভাবে এগুলো মেশানো হচ্ছে—এসব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে সর্বজনীন হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ছানা ও ক্রিম তৈরির পর অবশিষ্ট তরল নিয়েও অভিযোগ
দুধের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের দাবি, কিছু ব্যবসায়ী বাজার থেকে আসল দুধ সংগ্রহ করে তা থেকে ছানা, ক্রিম বা ফ্যাট আলাদা করেন। এরপর অবশিষ্ট তরল ফেলে না দিয়ে তাতে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে পুনরায় দুধের মতো তরল তৈরির চেষ্টা করা হয়।

চাটমোহরের রামনগর গ্রামের খামারি শাকিল হোসেনের দাবি, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন কারখানায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ দুধ থেকে ছানা ও ফ্যাট আলাদা করা হয়। এরপর অবশিষ্ট সাদা তরল রাসায়নিক মিশিয়ে কথিত নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তার অভিযোগ, এসব তরলের একটি অংশ অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পৌঁছায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসল দুধের সঙ্গে মেশানোর চেষ্টা করা হয়।
তবে শাকিল হোসেনের এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
অল্প খরচে বেশি লাভের অভিযোগ
ভেজাল কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করা ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যে, প্রায় ৪০ লিটার ননিবিহীন সাদা পানিতে আনুমানিক ৪৫০ টাকার বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে কথিত উচ্চফ্যাটযুক্ত দুধ তৈরি করা যায়। পরে ওই পরিমাণ তরল প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয় বলে তাদের দাবি।
এই হিসাবে প্রতি ৪০ লিটারে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত লাভ হতে পারে বলে তারা দাবি করেছেন।
এ ধরনের হিসাবের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে খামারিদের অভিযোগ, আসল দুধ উৎপাদনে গরুর খাদ্য, চিকিৎসা, শ্রম, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ থাকায় উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে তৈরি কথিত নকল দুধের উৎপাদন ব্যয় কম হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে কম দামে তা ছাড়তে পারেন।
অনলাইনে রাসায়নিক সংগ্রহের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, কথিত নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক অনলাইনে অর্ডার বা ফোনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা যায়। পরে কুরিয়ার বা স্থানীয় সরবরাহকারীর মাধ্যমে সেগুলো কথিত কারখানা বা উৎপাদনস্থলে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় খামারি ও দুগ্ধ ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ভেজালে ব্যবহার হতে পারে—এমন রাসায়নিকের বিক্রি, পরিবহন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারির দাবি উঠেছে।
অভিযানে জরিমানা, তবু থামছে না অভিযোগ
পাবনায় ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজনকে জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর বেড়ার পেচাকোলা ঘাট এলাকায় উত্তম ঘোষ ও পলি ঘোষ দম্পতিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে প্রশাসন। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর সাঁথিয়ার নাগডেমড়া এলাকায় জুঁই ডেইরি ফার্মের মালিককে বিভিন্ন অভিযোগে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এ ছাড়া ফরিদপুরের কেয়া ডেইরি, আমিনা ডেইরি ও প্রিমিয়াম ফুড, বেড়ার জয়দেব ঘোষ এবং ভাঙ্গুড়ার সিংগাড়ি গ্রামের আশরাফুল আলীকেও বিভিন্ন সময়ে শাস্তির আওতায় আনার তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রশাসনের এসব অভিযান থেকে বোঝা যায়, দুধের মান ও ভেজাল নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগের পাশাপাশি আইন প্রয়োগের ঘটনাও ঘটছে। তবে অভিযানের পরও অভিযোগ অব্যাহত থাকায় নিয়মিত নজরদারি ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
ক্ষতির মুখে প্রকৃত খামারিরা
ভেজাল দুধের অভিযোগ শুধু ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে প্রকৃত খামারিদের ওপরও।
বাওইখোলা গ্রামের খামারি আশরাফুল ইসলাম বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামে নকল দুধ বিক্রি করায় প্রকৃত খামারিদের বাজার নষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ উঠছে না বলে দাবি করেন তিনি।
তার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অনেক খামারি গরু পালন কমিয়ে দিতে বাধ্য হবেন। এতে ভবিষ্যতে স্থানীয় দুধ উৎপাদন আরও কমে গিয়ে বাজারে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
চাহিদার তুলনায় দুধের ঘাটতি
প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার লাখ লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার।
অর্থাৎ দৈনিক চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই ঘাটতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে কথিত নকল দুধ সরবরাহ করছেন।
দুধের চাহিদা পূরণে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে ভেজাল ঠেকানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিলিং সেন্টারে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, কিছু চিলিং সেন্টারে দুধ সরবরাহের ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট চিলিং সেন্টার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মান নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে।
সাঁথিয়ার স্থানীয় দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, প্রকৃত খামারিরা সাধারণত দুধে ভেজাল মেশান না। অতিরিক্ত লাভের আশায় কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ভেজাল দুধ সরবরাহ করেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার মতে, চিলিং সেন্টারে দুধ সংগ্রহের সময় যথাযথ মান যাচাই করা না হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেতে পারেন।
প্রাণ ডেইরির দাবি, ১৩ থেকে ১৪ ধাপে পরীক্ষা
ভেজাল দুধ সংগ্রহের অভিযোগের বিষয়ে প্রাণ ডেইরির ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) সৈকত শেখ বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল সফটওয়্যার ও এলএস মেশিনের মাধ্যমে ১৩ থেকে ১৪ ধাপে দুধ পরীক্ষা করে সংগ্রহ করে।
তার দাবি, পরীক্ষায় নির্ধারিত মানদণ্ডে না টিকলে অথবা ভেজাল শনাক্ত হলে সেই দুধ গ্রহণ করা হয় না।
সৈকত শেখ আরও দাবি করেন, ভেজাল দুধ গ্রহণ না করায় গত এক বছরে অসাধু চক্রের হামলায় তাদের কয়েকজন চিলিং সেন্টার কর্মী আহত হয়েছেন।
তার মতে, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান কঠোরভাবে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বিপণন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ এবং সব দুধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন মান যাচাই পদ্ধতি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
মিল্ক ভিটার চিলিং সেন্টারেও আধুনিক পরীক্ষা
মিল্ক ভিটার অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক ডা. সাইদুল ইসলাম বলেন, তাদের চিলিং সেন্টারগুলোতে দুধ সংগ্রহের সময় ফ্যাট, এসএনএফ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়।
তার ভাষ্য, পরীক্ষায় ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দুধ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ও ধ্বংস করা হয়।
এতে বোঝা যায়, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখলেও সব সংগ্রহকেন্দ্রে একই ধরনের পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে কি না—সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
শুধু চোখে দেখে নকল দুধ শনাক্ত কঠিন
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, প্রাকৃতিক দুধে বিভিন্ন উপাদানের স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকে। কৃত্রিমভাবে চর্বির মাত্রা তৈরি করা গেলেও দুধের প্রকৃত গঠন ও পুষ্টিমান নকল করা সম্ভব নয়।
তার মতে, প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু পরীক্ষায় সব ধরনের ভেজাল শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। এ জন্য স্বীকৃত পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ দুধের রং, ঘনত্ব বা ওপরের স্তর দেখে শুধু নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় যে সেটি খাঁটি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ ভেজাল দুধে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
তার ভাষ্য, রাসায়নিকযুক্ত দুধ বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দুধ শিশুদের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি থাকলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তাই শুধু উৎপাদন পর্যায় নয়, দুধ সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
পাবনায় স্থায়ী পরীক্ষাগারের দাবি
পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ভেজাল দুধ প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে দুধে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক শনাক্ত করার জন্য পাবনায় আধুনিক পরীক্ষাগার না থাকায় কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে রাজশাহী থেকে মাসে একবার ভ্রাম্যমাণ ল্যাব আসে। জেলায় একটি স্থায়ী পরীক্ষাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থায়ী পরীক্ষাগার চালু হলে সন্দেহজনক দুধ দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হবে এবং ভেজাল শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
নজরদারি বাড়ানোর দাবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাবনার দুগ্ধশিল্প রক্ষায় একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—দুধ সংগ্রহকেন্দ্রের নিবন্ধন ও নিয়মিত পরিদর্শন, প্রতিটি চিলিং সেন্টারে বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষা, সন্দেহজনক দুধের নমুনা সংরক্ষণ ও ল্যাব পরীক্ষা, ভেজালে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বিক্রি ও পরিবহন পর্যবেক্ষণ এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে প্রকৃত খামারিরা যাতে ন্যায্য দাম পান, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা। কারণ খামারিরা ন্যায্য মূল্য না পেলে দুধ উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন। আর উৎপাদন কমে গেলে বাজারে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
পাবনার দুগ্ধ অর্থনীতি তাই এখন একদিকে বিপুল সম্ভাবনার, অন্যদিকে মান নিয়ন্ত্রণের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। খামারি থেকে চিলিং সেন্টার, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বাজার—পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে ভেজাল দুধের অভিযোগ কমানোর পাশাপাশি প্রকৃত খামারি ও ভোক্তা—উভয়কেই সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।

