ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬

menu

গাইবান্ধায় বীরাঙ্গনা ফুলমতির রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১১:১৪ এএম

গাইবান্ধায় বীরাঙ্গনা ফুলমতির রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়

ছবিঃ সংগৃহীত

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্মম নির্যাতনের শিকার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধাহত নারী মুক্তিযোদ্ধা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে সাদুল্লাপুর উপজেলার উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

এ সময় সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হাসান কবীরসহ প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান শেষে হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিজ বাড়ির উঠানে পূর্বসূরিদের পাশে বীরাঙ্গনা ফুলমতিকে সমাহিত করা হয়।

৮৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে ফুলমতি

এর আগে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর সাদুল্লাপুরে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর ডান হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী ছিলেন।

মৃত্যুকালে তিনি চার ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি বহন করেছেন আজীবন

লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম সম্পাদিত হৃদয়ে একাত্তর গ্রন্থে ফুলমতির মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতনের বর্ণনা রয়েছে। গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ফুলমতি রানি নামে পরিচিত এই বীরাঙ্গনার জন্ম গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর স্বামীর বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে তাঁর সামনেই ফুলমতির ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। যুদ্ধের সময় নারীদের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে ফুলমতির জীবন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সাড়ে চার দশক পর ২০১৬ সালের মার্চে বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি। দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ও নির্যাতনের ইতিহাস আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে।

পরের বছর, ২০১৭ সালে তাঁর জন্য নির্মাণ করা হয় চার কক্ষের ‘বীর নিবাস’। স্বীকৃতির পাশাপাশি এই আবাসন তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করে।

অভাবের মধ্যেও আত্মমর্যাদা ধরে রেখেছিলেন

ফুলমতির ব্যক্তিজীবনও ছিল দীর্ঘ সংগ্রামে ভরা। তাঁর স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া ১৯৮৮ সালে মারা যান। এরপর পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে জীবনের কঠিন সময় পার করেন তিনি।

সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেননি ফুলমতি। পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। নিজের আত্মসম্মান ও দৃঢ়তার কারণে স্থানীয়দের কাছেও তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত নারী।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায়

মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের পর বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন শুক্রবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হয়।

উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গার্ড অব অনারের সময় প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল। পরে ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে নিজ বাড়ির উঠানে পূর্বসূরিদের পাশে তাঁর মরদেহ সমাহিত করা হয়।

বীরাঙ্গনা ফুলমতির মৃত্যুতে মুক্তিযুদ্ধের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের অবসান হলো। তাঁর জীবন ও মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতনের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একাত্তরের ভয়াবহতা এবং স্বাধীনতার জন্য মানুষের ত্যাগের স্মারক হয়ে থাকবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!