ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ধান ছেড়ে গ্রীষ্মকালীন শিমে স্বপ্ন, খানসামায় কৃষকের ঘুরছে ভাগ্যের চাকা

দিনাজপুর প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

ধান ছেড়ে গ্রীষ্মকালীন শিমে স্বপ্ন, খানসামায় কৃষকের ঘুরছে ভাগ্যের চাকা

ছবিঃ সংগৃহীত

কাল গড়িয়ে তখন বেলা। বাঁশের মাচাজুড়ে ঝুলছে সারি সারি কচি শিম। সবুজ পাতার আড়ালে ব্যস্ত কৃষক তায়জোদ আলী। এক হাতে গাছের ডাল সরিয়ে অন্য হাতে পরম যত্নে শিম তুলছেন তিনি। মুহূর্তেই ভরে উঠছে ঝুড়ি। যত্নে গড়ে তোলা ক্ষেতের উৎপাদিত শিম প্রতিদিনই যাচ্ছে স্থানীয় বাজারে।

গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে ভালো ফলন ও আশানুরূপ বাজারদর পেয়ে কৃষক তায়জোদ আলীর মুখে এখন স্বস্তির হাসি। তাঁর ক্ষেতের সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ। ধান চাষে উৎপাদন খরচ বাড়লেও অনেক সময় প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার দুশ্চিন্তার মধ্যে গ্রীষ্মকালীন শিম যেন খানসামার কৃষকদের সামনে বাড়তি আয়ের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছিট আলোকডিহি ডাক্তারপাড়া এলাকায় গেলেই চোখে পড়ে এমন সবুজের সমারোহ। হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের গ্রীষ্মকালীন শিমের আবাদকে ঘিরে সেখানে তৈরি হয়েছে নতুন আশাবাদ।

ধানের বিকল্প ফসলে কৃষকের আগ্রহ

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে ধান উৎপাদনে খরচ বাড়লেও সব সময় সে অনুযায়ী বাজারদর পাওয়া যায় না। এতে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক কৃষকই তুলনামূলক কম সময়ে ফলন পাওয়া এবং ভালো বাজারদর রয়েছে—এমন বিকল্প ফসলের সন্ধান করছেন।

কৃষি বিভাগের পরামর্শে খানসামার কয়েকজন কৃষক এবার গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ শুরু করেন। শুরুতেই ভালো ফলন ও বাজারদর পাওয়ায় তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আত্মবিশ্বাস। এক কৃষকের ক্ষেতের সাফল্য দেখে পাশের কৃষকরাও শিম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

জুলাইয়ে বীজ, সেপ্টেম্বরে ফলন

আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানগড় গ্রামের আলোকডিহি এলাকার কৃষক তায়জোদ আলী চলতি বছরের জুলাই মাসে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের শিমের বীজ রোপণ করেন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর ক্ষেতে শিম আসতে শুরু করে।

এরপর থেকে নিয়মিত ক্ষেত থেকে শিম সংগ্রহ করছেন তিনি। সংগ্রহ করা শিম পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাস পর্যন্ত ক্ষেত থেকে শিম পাওয়ার আশা করছেন তিনি।

তায়জোদ আলী বলেন, এ মৌসুমে তাঁর প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গাছে ভালো শিম ধরেছে। পাইকারের কাছে প্রতি কেজি শিম ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন। খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

ভালো ফলনে সন্তুষ্ট কৃষক ময়েজ উদ্দিন

একই এলাকার কৃষক ময়েজ উদ্দিনও কৃষি বিভাগের পরামর্শে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ করেছেন। ক্ষেতের ফলন ও বাজারদর—দুই দিক থেকেই সন্তুষ্ট তিনি।

ময়েজ উদ্দিন বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল বিন আমিনের পরামর্শে তিনি এ জাতের শিম চাষ শুরু করেন। ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর ক্ষেতের ফলন দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও শিম চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

অন্যের ক্ষেত দেখে ৩০ শতকে শিম চাষ

স্থানীয় কৃষক মো. সাদেক মিয়াও অন্য কৃষকের সাফল্য দেখে গ্রীষ্মকালীন শিম চাষে আগ্রহী হন। সুমজ আলী ও সনজব আলীর ক্ষেতের ফলন দেখে উৎসাহিত হয়ে তিনি কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেন। পরে ৩০ শতক জমিতে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের শিমের আবাদ করেন।

সাদেক মিয়া জানান, পাইকাররা তাঁর ক্ষেত থেকে প্রতি কেজি শিম ১০০ থেকে ১১০ টাকা দরে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাজারে একই শিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ক্ষেতের ফলন ভালো হওয়ায় অক্টোবর পর্যন্ত বিক্রি চলবে বলে আশা করছেন তিনি। এতে ভালো আয় হবে বলেও প্রত্যাশা তাঁর।

গ্রীষ্ম ও বর্ষায় সহনশীল আর্লি-৪৫

কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, শীতকালে বিভিন্ন জাতের শিম চাষ হলেও গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে শিম উৎপাদনের জন্য হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতটি সম্ভাবনাময়। এ জাতটি গ্রীষ্ম ও বর্ষার আবহাওয়ার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে মানিয়ে নিতে পারে।

ছাতিয়ানগড় ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল বিন আমিন বলেন, কৃষকদের বীজ রোপণ, মাচা তৈরি, পরিচর্যা এবং পোকামাকড় দমনের বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

পোকামাকড় দমনে কৃষকরা ইয়োলো ট্র্যাপ ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি জমিতে বেশি পরিমাণে গোবর ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এসব পদ্ধতি অনুসরণ করলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রেখে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব বলে তিনি জানান।

কৃষি বিভাগের সহায়তায় বাড়ছে আবাদ

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলতি মৌসুমে ২০ শতক জমিতে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের গ্রীষ্মকালীন শিমের আবাদ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের বীজ, সার, ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় শিমের চাষ দেখে উৎসাহিত হয়ে কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে আরও প্রায় ১ একর ৪০ শতক জমিতে একই জাতের শিমের আবাদ করেন।

সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে খানসামা উপজেলায় ৭ থেকে ৮ একরের বেশি জমিতে গ্রীষ্মকালীন শিমের আবাদ হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।

সাফল্য দেখে বাড়ছে কৃষকের আগ্রহ

খানসামায় আগে গ্রীষ্মকালীন শিমের চাষ খুব একটা দেখা যেত না। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্যোগে কয়েকজন কৃষককে দিয়ে এ চাষ শুরু হওয়ার পর এবার ভালো ফলন ও বাজারদর পাওয়ায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার বলেন, খানসামায় আগে গ্রীষ্মকালীন শিমের চাষ তেমন হতো না। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের উদ্যোগে কয়েকজন কৃষককে দিয়ে এ চাষ শুরু করা হয়। এবার ফলন ভালো হয়েছে এবং কৃষকরা বাজারে ভালো দামও পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, কৃষকদের সাফল্য দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। ভবিষ্যতে খানসামায় গ্রীষ্মকালীন শিমের আবাদ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

বিকল্প ফসলে নতুন সম্ভাবনা

ধান চাষের পাশাপাশি বিকল্প ফসল হিসেবে গ্রীষ্মকালীন শিম এখন খানসামার কৃষকদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তুলনামূলক অল্প সময়ের মধ্যে ফলন পাওয়া, স্থানীয় ও পাইকারি বাজারে চাহিদা থাকা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতা—সব মিলিয়ে এ ফসলের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের কয়েকটি ক্ষেতের সাফল্য ইতোমধ্যে আশপাশের কৃষকদের উৎসাহিত করছে। কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে ভবিষ্যতে গ্রীষ্মকালীন শিম শুধু বাড়তি আয়ের উৎসই নয়, ধানের পাশাপাশি একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প ফসল হিসেবেও আরও বিস্তৃত হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!